অভাবে শ্রম ডেকে আনে উপকূলীয় শিশুদের জীবনে

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : দারিদ্র্য, জলবায়ু সংকট আর সামাজিক অনিশ্চয়তার চাপে সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে ক্রমেই বাড়ছে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ। সরকারি–বেসরকারি নানা উদ্যোগ থাকলেও শ্যামনগর উপজেলায় শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে শত শত শিশু। কেউ ইটভাটায়, কেউ দোকানে, কেউবা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে যুক্ত হয়ে হারাচ্ছে শৈশব।

শ্যামনগর উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে উপজেলার ৪৬টি বিদ্যালয়, ৩৬টি মাদ্রাসা ও ৩টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ৫ হাজার ৬৫৭ জন। তিন বছর পর ২০২৩ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র ৩ হাজার ২৯৩ জন। অর্থাৎ একই ব্যাচের অন্তত ২ হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে।

শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছেলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও শিশুশ্রম। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহই মূল কারণ। বিয়ে হওয়ার পর অধিকাংশ মেয়ের পক্ষেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।

কৈখালী ইউনিয়নের সাপখালী গ্রামের এক অভিভাবক বলেন, ‘অভাবের কারণে মেয়েকে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে দিতে বাধ্য হই। কয়েক মাসের মধ্যেই সংসার ভেঙে যায়। এখন মেয়েটা বাড়িতেই আছে, পড়াশোনায় আর ফিরতে পারেনি।’

একই এলাকার মোস্তফা গাজী জানান, দরিদ্রতার কারণে তাঁর ছেলেকে সপ্তম শ্রেণির পর পড়াশোনা বন্ধ করে ইটভাটায় পাঠাতে হয়েছে। বলেন, ‘কাজ না করলে পেটে ভাত জুটবে না। শিশুশ্রম কী, তা বোঝার সুযোগ আমাদের নেই।’

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক বলেন, ‘সপ্তম থেকে দশম শ্রেণিতে বাল্যবিবাহের হার তুলনামূলক বেশি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। তবে দারিদ্র্যজনিত শিশুশ্রম উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।’

জোবেদা সোহরাব মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সাত্তার জানান, ২০২০ সালে তাঁর বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ৯৭ জন শিক্ষার্থী ছিল। এসএসসি পরীক্ষার আগেই ৯ জন ছাত্রীর বিয়ে হয়ে যায়, আর পাঁচজন ছেলে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যোগ দেয়।

কৈখালী শামছুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শেখ সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে ৩৩ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। তাদের অধিকাংশই বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমে জড়িয়ে গেছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহকে আরও ত্বরান্বিত করছে। সিডর, আইলা, আম্ফানের মতো ঘূর্ণিঝড়ে সর্বস্ব হারিয়ে বহু পরিবার জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। সেই সঙ্গে শিশুরাও যুক্ত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে।

কুমিল্লার গোমতী নদীর তীরে একটি ইটভাটায় কাজ করা ১৪ বছর বয়সী জাহিদ হোসেন ছিল সাতক্ষীরার শ্যামনগরের এক মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। অভাবের কারণে মা–ছেলে দুজনই এখন ইটভাটায় শ্রমিক। জাহিদের মা বলেন, ‘ছেলেটাকে পড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আগে তো পেট চালাতে হয়।’

ইটভাটাগুলোতে কাজ করা অধিকাংশ শিশুই সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলীয় এলাকা থেকে আসা। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের নিচে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ বেআইনি হলেও বাস্তবে এই আইন মানা হচ্ছে না।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ শুধু শিক্ষাজীবন নয়, শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশকেও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দলগত খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও স্বাভাবিক শৈশব থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে।

উপকূলীয় বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা এসব শিশু আজ শুধু দারিদ্র্যের শিকার নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের নীরব ভুক্তভোগী। কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, দারিদ্র্য হ্রাস ও জলবায়ু অভিযোজনমূলক উদ্যোগ ছাড়া এই শিশুদের শিক্ষা ও শৈশব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।