মিঠাপুকুরে ‘ফকির বাড়ী পল্লি জাদুঘর’, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের জীবন্ত পাঠশালা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

রংপুর প্রতিনিধি : রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা-এর নিভৃত গ্রাম এনায়েতপুরে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমধর্মী এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র—‘ফকির বাড়ী পল্লি জাদুঘর ও পাঠশালা’। ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই সংগ্রহশালা ইতোমধ্যে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

উপজেলার কাফ্রিখাল/বালারহাট ইউনিয়নের সাতভেন্টি এনায়েতপুর গ্রামে অবস্থিত জাদুঘরটি রংপুর শহর থেকে প্রায় ২০–২৫ কিলোমিটার দূরে। পাকা সড়ক থেকে কিছুটা কাঁচা পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছাতে হয়, যা দর্শনার্থীদের জন্য ভিন্নধর্মী গ্রামীণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

প্রায় কয়েক একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই জাদুঘরের চারপাশে রয়েছে সবুজ প্রকৃতি, পদ্মদিঘি ও বাঁশের সাঁকো—যা একে করে তুলেছে নান্দনিক ও শান্ত পরিবেশের একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্র।

এই জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী আতিকুর রহমান (আদিল ফকির)। ছাত্রজীবন থেকেই পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী জিনিস সংগ্রহে আগ্রহী ছিলেন তিনি। ২০০৫ সাল থেকে শুরু হয় তার সংগ্রহ কার্যক্রম। পরে ২০১৩ সালে জমি ক্রয় করে ২০১৬–১৭ সালের মধ্যে জাদুঘরের অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করেন।

তার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান এখন স্থানীয়ভাবে গর্বের প্রতীক।

জাদুঘরটিতে সংরক্ষিত রয়েছে গ্রামবাংলার অতীত জীবনের নানা উপকরণ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—ঢেঁকি, লাঙলসহ কৃষি সরঞ্জাম, হারিকেন ও কুপিবাতি, গ্রামোফোন, পুরনো রেডিও, তালপাতার পাখা, একতারা, বিভিন্ন দেশের প্রায় ১৮৩টি পুরনো মুদ্রা ও ডাকটিকিট।

এসব সংগ্রহ গ্রামীণ জীবনযাত্রা, কৃষি সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, যা নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

জাদুঘরের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে একটি পাঠশালা, যেখানে শিশু-কিশোরদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এখানে শিক্ষার্থীদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করা, সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত করা এবং গবেষণামূলক আগ্রহ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ফলে এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়, বরং একটি ‘জীবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র’ হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসছেন। কেউ খুঁজে পান শৈশবের স্মৃতি, কেউ দেখেন গ্রামবাংলার পুরনো জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও শিক্ষাসফরের জন্য স্থানটি বেছে নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচার পেলে ‘ফকির বাড়ী পল্লি জাদুঘর ও পাঠশালা’ ভবিষ্যতে একটি উল্লেখযোগ্য লোকজ গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।