অতিরিক্ত লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহে শ্যামনগরে বিপর্যস্ত জনজীবন চিংড়ি মরছে, পানির জন্য হাহাকার, কাজ হারাচ্ছেন শ্রমজীবীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরে তীব্র তাপপ্রবাহ ও লবণাক্ততার প্রভাবে জনজীবন চরম দুর্ভোগে পড়েছে। টানা কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকায় ঘরে-বাইরে কোথাও মিলছে না স্বস্তি। খরতাপ ও আর্দ্রতায় মানুষের জীবন যেন স্থবির হয়ে পড়েছে।

দুপুর গড়াতেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। মানুষ ছায়ার খোঁজে ঘুরছে, আর সুপেয় পানির জন্য চলছে হাহাকার। আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপকূলীয় এলাকায় অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তাপপ্রবাহের বড় ধাক্কা লেগেছে শ্যামনগরের অর্থনীতির অন্যতম খাত—নোনা পানির চিংড়ি চাষে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ঘেরের পানির লবণাক্ততা বেড়ে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে। এতে ব্যাপক হারে চিংড়ি মারা যাচ্ছে, যা স্থানীয়ভাবে ‘মরক’ নামে পরিচিত।

রমজাননগরের ঘেরচাষি বজলুর রহমান বলেন, “ঘেরের পানি এতটাই গরম হয়ে গেছে যে চিংড়ি টিকছে না। প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকার ক্ষতি হচ্ছে।”

আরেক চাষি হাবিবুর রহমান বলেন, “এখন চিংড়ি তোলার সময়। কিন্তু গরম ও লবণাক্ততায় সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানি বদলানোর সুযোগও নেই।”

তীব্র গরমে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। সকাল ১০টার পর থেকেই রোদ অসহনীয় হয়ে উঠছে। দিনমজুর, কৃষক, ভ্যানচালক, ইটভাটার শ্রমিক—অনেকেই কাজ করতে পারছেন না।

নূরনগরের দিনমজুর আসাদ গাজী বলেন, “গরমে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছি। কাজ করতে পারি না। ঘরে খাবার নেই, পানির জন্য দূরে যেতে হয়।”

শ্যামনগরের বিভিন্ন গ্রামে পুকুর শুকিয়ে গেছে, অনেক নলকূপে পানি উঠছে না। ফলে সুপেয় পানির জন্য মানুষকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি।

অনেকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করছেন। আবার কেউ কেউ সাময়িক স্বস্তির জন্য ডাব, শরবত বা ঠান্ডা পানীয়ের ওপর নির্ভর করছেন।

শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান বলেন, “এই গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। সবাইকে ছায়াযুক্ত স্থানে থাকা, বেশি পানি পান করা এবং ওআরএস খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

তাপপ্রবাহ ও পানির সংকটে কৃষিক্ষেত্রেও প্রভাব পড়েছে। অনেক জমির ফসল শুকিয়ে যাচ্ছে। খাল-বিল ও সেচ ক্যানেলে পানি না থাকায় বীজতলা রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা।

পরিবেশকর্মী হারুন-আর-রশিদ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা ও পানির সংকট একসঙ্গে দেখা দিচ্ছে। এটি ধীরে ধীরে মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে।”

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক বলেন, “পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও মৎস্য বিভাগকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পানির সংকট নিরসনে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় এই অঞ্চলে আগে থেকেই লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি ছিল। এর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ যুক্ত হওয়ায় জীবন-জীবিকা আরও সংকটে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।