ইটভাটার ধোঁয়া থেকে সবুজ স্বপ্ন: লক্ষ্মীপুরে দুই ভাইয়ের ‘আনোয়ার নার্সারি’

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : একসময় ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল লক্ষ্মীপুরের পিয়ারাপুর এলাকা। শ্বাস নেওয়াই ছিল কষ্টকর। সেই এলাকাতেই এখন চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ—ফুলের সুবাসে ভরা এক প্রাণবন্ত বাগান। ইটভাটার ছাই সরিয়ে এই সবুজ স্বপ্ন গড়ে তুলেছেন দুই ভাই মোরশেদ ও আনোয়ার হোসেন। তাঁদের হাত ধরেই গড়ে উঠেছে ‘আনোয়ার নার্সারি’।

মাত্র ৮ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা এই উদ্যোগ বর্তমানে ২৫ লাখ টাকারও বেশি মূলধনের একটি সফল নার্সারিতে রূপ নিয়েছে। ছোট একটি বাগান দিয়ে শুরু হলেও এখন নার্সারির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়টিতে। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে ১২ জন শ্রমিকের।

নার্সারিতে নিয়মিত কাজ করেন ৮ জন শ্রমিক। পাশাপাশি আরও ৪ জন শ্রমিক ভ্যানে করে আশপাশের গ্রামগুলোতে গাছ বিক্রি করেন। নার্সারির শ্রমিক মো. রফিক বলেন,
“আগে এই এলাকায় ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে টিকে থাকা কঠিন ছিল। এখন সারাদিন গাছের মধ্যেই থাকি। এখান থেকে যে মজুরি পাই, তা দিয়ে আমাদের সংসার ভালোভাবেই চলে।”

ভ্যানে গাছ বিক্রি করা শ্রমিক কামাল হোসেন বলেন,
“১০ টাকার চারা থেকে শুরু করে দামি চারাও আমরা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিই। এখন মানুষ গাছ লাগাতে অনেক বেশি আগ্রহী।”

শুধু গাছ কেনাবেচার জায়গা নয়, ‘আনোয়ার নার্সারি’ এখন অনেকটাই একটি সবুজ বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন বাগান দেখতে, গাছ কিনতে কিংবা পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে।

নার্সারিতে গাছ কিনতে আসা আরিফুল ইসলাম বলেন,
“অনলাইনে গাছ কিনে অনেক সময় প্রতারিত হয়েছি। এখানে এসে নিজের চোখে দেখে পছন্দ করে চারা নিতে পারছি। দামও তুলনামূলক কম, পরিবেশটাও খুব সুন্দর।”

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সুমি আক্তার বলেন,
“বাচ্চাদের গাছ চেনানোর জন্য নিয়ে এসেছি। একসময় এখানে ইটভাটার ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসত। এখন এখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি। নিম, আম আর কয়েকটি ঔষধি চারা কিনেছি।”

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা সরকারি সহায়তা ছাড়াই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমকে পুঁজি করে এই সফলতা পেয়েছেন দুই ভাই। উদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন বলেন,
“আমাদের লক্ষ্য হলো—মানুষ যেন অনলাইনে প্রতারিত না হয়ে সরাসরি দেখে সুস্থ ও মানসম্মত চারা সংগ্রহ করতে পারে। পাশাপাশি আমরা সরকারি ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও নিয়মিত ফুল ও গাছ দিয়ে সাজসজ্জার কাজ করে থাকি।”

বর্তমানে নার্সারিতে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা দামের চারা পাওয়া যায়। নিম, বিভিন্ন জাতের আম, নারিকেল, সুপারি ছাড়াও রয়েছে দুর্লভ ঔষধি ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ। ইটভাটার ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে গড়ে ওঠা এই সবুজ উদ্যোগ এখন লক্ষ্মীপুর জেলার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।