যুগ যুগ ধরে টেকসই বাঁধের আশায় উপকূলবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম : দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় মানুষের কাছে বাঁধ মানেই বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। কিন্তু সেই বাঁধই এখন আর জোয়ারের পানিও ঠেকাতে পারছে না। ষাটের দশকে নির্মিত নিচু ও জীর্ণ বাঁধগুলো সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে গিয়ে আজ প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস এলেই আতঙ্কে দিন কাটছে লাখো মানুষের।

খুলনার কয়রা উপজেলার লোকা এলাকায় বসবাসকারী সাহিদা খাঁর জীবন যেন এ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে তাঁর বসতভিটা বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে বাঁধের ওপরই বসবাস করছেন তিনি। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে কপোতাক্ষ নদ ফুঁসে উঠলে নতুন করে আতঙ্কে পড়েছেন সাহিদা। তাঁর আশঙ্কা, শেষ আশ্রয়টুকুও হয়তো এবার হারাতে হবে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো এখন আর মানুষের জানমাল রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, মহাসেন ও আম্পানের আঘাতে এসব বাঁধ ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও সাময়িক সংস্কার করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বাঁধ উঁচু ও টেকসই করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।

এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নদ-নদীতে পলি জমে তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের পানির উচ্চতা বেড়েছে। ফলে স্বাভাবিক সময়েই অনেক জায়গায় বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের সময় উপকূলজুড়ে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট বেশি ছিল, যা বহু এলাকায় প্লাবন সৃষ্টি করে।

পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় বাঁধ উপচে জোয়ারের পানি লোকালয় প্লাবিত করেছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

বরগুনার তালতলী উপজেলার খোট্টার চর গ্রামের বাসিন্দা ছোমেদ খান বলেন, “জোয়ারের পানিতে বাড়িঘর ডুবে গেছে। ঘরে থাকতে পারি না। পরিবার নিয়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি। রাতে পানি আরও বাড়বে—এই ভয়েই আছি।”
তাঁর ছেলে গোলাম কবির বলেন, “বাঁধ দেওয়ার আশ্বাস অনেকবার পেয়েছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দিনে-রাতে জোয়ারে দুইবার ভাসি।”

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, বরিশাল বিভাগের প্রায় ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে মাত্র ৫৯ কিলোমিটার টেকসইভাবে উন্নয়ন করা হয়েছে। বাকি অধিকাংশ বাঁধ এখনো পুরোনো অবস্থাতেই রয়েছে। প্রতি বছর জোড়াতালি দিয়ে এগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।

দেশজুড়ে পাউবোর প্রায় ১১ হাজার ৪৩০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে, যার মধ্যে ৫ হাজার ১৬০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায়। এসব বাঁধের একটি বড় অংশই বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা এবং সর্বশেষ আম্পানে শত শত কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন সময় বাঁধ সংস্কার ও উন্নয়নের প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবায়নে ধীরগতি ও অর্থসংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া কয়েকটি প্রকল্পের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। খুলনা অঞ্চলেও নতুন প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনসুর রহমান বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগাম ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা সম্ভব। সময়মতো মেরামত করা গেলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো যেত।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য, বড় কোনো দুর্যোগ এলেই বাঁধ উন্নয়নের আলোচনা শুরু হয়, কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা থেমে যায়। ফলে বছরের পর বছর ধরে একই ঝুঁকি বহন করে চলছেন উপকূলের মানুষ।

উপকূলবাসীর দাবি, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বাঁধ উঁচু ও শক্তিশালী করে নির্মাণ ছাড়া এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি নেই। অন্যথায় প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়েই নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে তাঁদের।