
নিজস্ব প্রতিবেদক : অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত ঝুঁকির মুখে রয়েছে বাংলাদেশ। এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুষ্টিকে আর প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং একে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, জলবায়ু অভিযোজন এবং সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল রোববার রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় সমকাল কার্যালয়ে ‘স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ: ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা এবং জলবায়ুজনিত ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে পুষ্টির ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান (আইপিএইচএন), ম্যাক্স ফাউন্ডেশন ও সমকাল যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক পরামর্শক ড. এএফএম ইকবাল কবীর। তিনি বলেন, পুষ্টিকে স্বাস্থ্য খাতের সহায়ক বিষয় হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনের মূল বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। তাঁর ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তন, সংক্রামক রোগের বিস্তার এবং পুষ্টিহীনতা একে অপরকে প্রভাবিত করে এক নতুন ঝুঁকির চক্র তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, অপুষ্টি শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া বা এইচআইভির মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ে। আবার এসব রোগ পুষ্টির অবস্থা আরও খারাপ করে এক ধরনের দুষ্টচক্র সৃষ্টি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. আলী আব্বাস মোহাম্মদ খোরশেদ বলেন, দেশে পুষ্টি নিয়ে গবেষণা ও নীতিমালার ঘাটতি নেই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর প্রয়োগ এখনও সীমিত। “পুষ্টিকে আমরা এখনও সহায়ক বিষয় হিসেবে দেখি, মূল বিষয় হিসেবে নয়”—বলেন তিনি।
হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনালের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যপ্রধান ডা. আফসানা হাবিব শিউলী জানান, দেশে নারীদের মধ্যে আয়রন, ভিটামিন ‘এ’ ও জিংকের ঘাটতি ব্যাপক। “গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি দুইজন নারীর একজন কোনো না কোনো পুষ্টিঘাটতিতে ভুগছেন”—বলেন তিনি। বহুমাত্রিক পুষ্টি সাপ্লিমেন্ট কার্যকর হলেও এর প্রাপ্যতা ও ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আজিজ খান বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য পুষ্টিতে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে পুষ্টির কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। “পুষ্টিকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে”—বলেন তিনি।
নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. একেএম মুসা বলেন, পুষ্টিকে স্বাস্থ্যসেবার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ জন্য সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
কেয়ার বাংলাদেশের পুষ্টি বিভাগের প্রধান মোহাম্মাদ হাফিজুল ইসলাম বলেন, পুষ্টি কোনো একক মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়; স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে বাস্তবে এই সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ড প্রধান সাইকা সিরাজ বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের সঙ্গে পুষ্টিকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ুর প্রভাব পুষ্টির ওপর কীভাবে পড়ছে, তা গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারলে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া সহজ হবে।
আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ড. মো. মুনীরুল ইসলাম বলেন, অপুষ্টি, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা থাকলেও বাস্তবায়নে তা প্রতিফলিত হয় না। তিনি রিয়েল-টাইম ডেটা ও অভিযোজনযোগ্য কর্মসূচির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ডা. মিথুন গুপ্তা বলেন, দেশে পুষ্টি কার্যক্রমের বড় অংশই প্রকল্পনির্ভর ও দাতা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, যা টেকসই নয়। পাশাপাশি বরাদ্দকৃত বাজেট যথাযথভাবে ব্যবহৃত না হওয়াও একটি বড় সমস্যা।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ড. সানথিয়া আইরিন বলেন, খাদ্যাভ্যাস, কুসংস্কার, লিঙ্গবৈষম্য ও কম সচেতনতা পুষ্টি উন্নয়নের বড় বাধা। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক এজাজ বলেন, পুষ্টি বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
গেইনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. আবুল বাসার চৌধুরী বলেন, পুষ্টিতে বিনিয়োগের কার্যকর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকায় ব্যয় ও ফলাফল মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক ডা. রওশন জাহান আখতার আলো বলেন, মাঠপর্যায়ে দক্ষ জনবলের অভাব পুষ্টিসেবা বিস্তারে বড় বাধা। অনেক হাসপাতালে পুষ্টি কর্নার থাকলেও প্রশিক্ষিত জনবল নেই।
বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের মহাপরিচালক ডা. রিজওয়ানুর রহমান জানান, ২০১৫ সালের জাতীয় পুষ্টি নীতি হালনাগাদের কাজ চলছে। নতুন নীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে ‘ন্যাশনাল প্ল্যান অব অ্যাকশন ফর নিউট্রিশন’ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, সীমিত বাজেটের মধ্যেও পুষ্টি উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে খাদ্যাভ্যাস বিষয়ক গাইডলাইন প্রণয়ন, ভিটামিন ডি ঘাটতি নিয়ে গবেষণা এবং মায়ের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।
ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. তারিকুল ইসলাম বলেন, একজন মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণে দৈনিক প্রায় ১১২ টাকা প্রয়োজন, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয়বহুল। ফলে পুষ্টিতে বৈষম্য বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলীর সভাপতিত্বে বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সহযোগী সম্পাদক শেখ রোকন।
