নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মেঘনায় ইলিশ শিকার, বাড়ছে জাটকা নিধন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

নিজস্ব প্রতিবেদক, লক্ষ্মীপুর : মেঘনা নদী-এর অভয়াশ্রম ঘোষিত এলাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারে নেমেছেন জেলেরা। পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে গত কয়েক দিনে এ প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় আড়তদার ও সংশ্লিষ্টরা। জেলেদের দাবি, ঋণের চাপ ও সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে তারা নদীতে নামছেন। একই সঙ্গে কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও ১ মার্চ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ওই এলাকায় মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। তবে দিনের বেলায় প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও রাত নামলে নদীতে নজরদারি কমে যায়। এ সুযোগে দলবেঁধে জেলেরা নদীতে নেমে জাল ফেলছেন এবং ভোরে মাছ নিয়ে তীরে ফিরে আসছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বুড়িরঘাট, রায়পুর-চরভৈরবী সীমান্ত, কমলনগরের মতিরহাট, নাছিরগঞ্জ ও মাতবরহাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দিন-রাত ইলিশ ও জাটকা শিকার চলছে। গত শনিবার সকালে রায়পুর-চরভৈরবী সীমান্তের একটি ঘাটে ২০ মিনিটে সাতটি নৌকা ভিড়তে দেখা যায়। জেলেরা নৌকা থেকে জাটকা নামিয়ে ঘাটেই বিক্রি করছেন। অপেক্ষমাণ ক্রেতারা টুকরি ধরে মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি টুকরি জাটকা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি টুকরিতে ১০ থেকে ১৫ কেজি মাছ থাকে।

একই দিন বিকেলে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাটসংলগ্ন বুড়িরঘাটে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক নৌকা ভিড়ে। নৌকা ঘাটে লাগার সঙ্গে সঙ্গেই পকেট আড়তদার ও ক্রেতাদের মধ্যে মাছ কেনার হুড়োহুড়ি দেখা যায়। কমলনগরের মতিরহাট এলাকাতেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে এক ঘণ্টায় অন্তত ১০টি নৌকা মাছ নিয়ে ঘাটে আসে এবং পাইকারি ব্যবসায়ীরা দ্রুত দরদাম করে মাছ কিনে নেন।

স্থানীয় আড়তদাররা জানান, নববর্ষকে কেন্দ্র করে ইলিশের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে দামও চড়া। মাঝারি আকারের ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকা এবং এক কেজি ওজনের ইলিশ ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ কারণে অনেক ক্রেতা সরাসরি নদীর ঘাটে গিয়ে মাছ কিনছেন।

কয়েকজন জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় তারা চরম আর্থিক সংকটে আছেন। অনেকেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করছেন। তাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা টাকার বিনিময়ে মাছ ধরার সুযোগ দেন, আর টাকা না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন। তিনি বলেন, জনবল সংকট থাকলেও নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। নববর্ষ উপলক্ষে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।

লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান বলেন, ইলিশ ধরা এখন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ—এ বিষয়টি স্থানীয়দের জানা আছে। কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ড ও পুলিশকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলতি মৌসুমে ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল হবে।