সাতক্ষীরায় হারিয়ে যাচ্ছে মুণ্ডাদের মাতৃভাষা ‘মুণ্ডারি’

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি | সাতক্ষীরা : বাংলা ভাষাভাষীদের সঙ্গে ওঠাবসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া এবং কর্মক্ষেত্রে বাংলার প্রাধান্য—সব মিলিয়ে নিজেদের মাতৃভাষা ‘মুণ্ডারি’ হারানোর মুখে পড়েছে সাতক্ষীরার মুণ্ডা সম্প্রদায়। মাঝে মধ্যে নিজেদের মধ্যে কথা বললেও নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর ঠিকভাবে বলতে পারেন না এই প্রাচীন ভাষা।

সাতক্ষীরার তালা ও শ্যামনগর উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মুণ্ডাদের বসবাস। তাদের নিজস্ব ভাষা মুণ্ডারি, যা অস্ট্রো-এশীয় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তবে ভাষাটির কোনো কার্যকর লিখিত রূপ বর্তমানে নেই। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে বর্ণমালা; মুখে মুখে প্রচলিত ভাষাও এখন বিলুপ্তির পথে।

দুই শতাব্দীর ইতিহাস

সুন্দরবন আদিবাসী মুণ্ডা সংস্থা (সামস)–এর নির্বাহী পরিচালক কৃঞ্চপদ মুণ্ডা জানান, প্রায় ২৩০ বছর আগে ভারতের ঝাড়খণ্ডের রাঁচি অঞ্চল থেকে মুণ্ডাদের এ অঞ্চলে আনা হয়। সুন্দরবন কেটে বসতি স্থাপন ও আবাদযোগ্য ভূমি তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিলেন তারা। বর্তমানে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

উপকূলীয় শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন ভেটখালী মুণ্ডা পল্লীতে কথা হয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে। তাঁরা জানান, একসময় ঘরে-বাইরে মুণ্ডারি ভাষায় কথা বলা হলেও এখন প্রবীণ কয়েকজন ছাড়া তা বলতে পারেন না কেউ। চর্চার অভাবে নতুন প্রজন্ম ভাষাটি শিখছে না।

ভাষার শেকড় ও প্রভাব

নৃতত্ত্ববিদদের মতে, মুণ্ডারি ভাষা ভারতীয় আর্যভাষার চেয়েও প্রাচীন। উড়িয়া, অসমিয়া ও বাংলা ভাষার প্রাথমিক বিকাশে এ ভাষার প্রভাব রয়েছে। খাসিয়া, গারো, সাঁওতাল ও কোল ভাষার সঙ্গেও মুণ্ডারি ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। তবে বর্তমানে অনেক মুণ্ডা পরিবার নিজেদের মধ্যে ‘শাদ্রী’ ভাষা ব্যবহার করছে, ফলে মুণ্ডারি আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।

সংস্কৃতিও সংকটে

মুণ্ডারা মূলত প্রকৃতি পূজারি। প্রতিবছর ভাদ্র মাসে তারা ‘কারাম’ উৎসব পালন করেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবন অঞ্চলে কারাম গাছ কমে যাওয়ায় উৎসব আয়োজনও ব্যাহত হচ্ছে। নিজস্ব শাসনব্যবস্থা, আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামোও আগের মতো সক্রিয় নেই বলে জানান সম্প্রদায়ের প্রবীণরা।

তাঁদের দাবি, ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় দক্ষিণাঞ্চলে একটি মুণ্ডা ভাষাচর্চা কেন্দ্র স্থাপন জরুরি। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় ভাষাচর্চা কেন্দ্র থাকলেও সুন্দরবন অঞ্চলে এখনো তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পাঠ্যপুস্তকে মুণ্ডারি ভাষার বর্ণমালা অন্তর্ভুক্তির দাবিও জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মত

কালিগঞ্জ সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সাহিত্যিক গাজী আজিজুর রহমান বলেন, দেশে প্রায় ৪৮টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩১টি স্বীকৃতি পেয়েছে। অনেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা থাকলেও মুণ্ডাদের বর্ণমালা কার্যত হারিয়ে গেছে। ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার অভাবে তারা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

সাতক্ষীরার মানবাধিকারকর্মী অধ্যক্ষ আশেক-ই-ইলাহী বলেন, বৈচিত্র্যই একটি দেশের শক্তি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তা না হলে মুণ্ডাদের মতো প্রাচীন জনগোষ্ঠীর ভাষা ও ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

সংরক্ষণের দাবি

মুণ্ডা নেতাদের ভাষ্য, ২০১৫ সাল থেকে তারা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ভাষা সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় মুণ্ডারি ভাষা এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

সাতক্ষীরার মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষের প্রত্যাশা—তাদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের শেকড়কে চিনতে পারে।