
কৃষি বিভাগ জানায়, সাতক্ষীরার বেলে দোঁয়াশ মাটি ও নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু কুল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অন্যান্য ফসলের তুলনায় কম খরচে ভালো ফলন পাওয়ায় এবং বাজারে চাহিদা থাকায় অনেক কৃষক এখন কুল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। সাতক্ষীরার সুস্বাদু কুলের চাহিদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আমের পাশাপাশি সাতক্ষীরার কুল বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।
আবাদ ও উৎপাদন
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় এক হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের কুলের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন কুল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১৬০ কোটি টাকা।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় অনাবাদি ও পতিত জমিতে এখন সারি সারি কুলগাছ দেখা যাচ্ছে। বল সুন্দরী, ভারত সুন্দরী, থাই কুল, আপেল কুল, বাউ কুল, তাইওয়ান কুল, নারিকেল কুল, ঢাকা নাইনটি ও টক কুলসহ নানা জাতের কুল চাষ হচ্ছে।
কৃষকের কথা
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাঁশদহা ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের কৃষক ইমদাদুল হক জানান, তাঁর দুই বিঘা জমিতে কুলের বাগান রয়েছে। সেখানে ভারত সুন্দরী, বল সুন্দরী ও টক কুল—এই তিন জাতের কুল চাষ করেছেন।
ইমদাদুল হক বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। দামও মোটামুটি ভালো পাচ্ছি। তবে সার ও কীটনাশকের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় চাষে খরচ বেশি পড়েছে।’
তিনি জানান, দুই বিঘা জমিতে কুল চাষে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বিক্রি থেকে প্রায় এক লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন। তবে খরচ বাড়ায় লাভ কিছুটা কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
একই এলাকার আরেক কুলচাষী মোরশেদুল আলম জানান, তিনি চার বিঘা জমিতে টক, থাই আপেল, বল আপেল ও বিলাতি কুল চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, বিলাতি কুল বর্তমানে কেজিপ্রতি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্য জাতগুলোর দাম ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে।
শ্রমসংস্থানেও ভূমিকা
কুল চাষ স্থানীয় শ্রমসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাঁশদহা ইউনিয়নের কুল বাগানের শ্রমিক আকছেদ আলী জানান, প্রতিদিন কুল বাগানে কাজ করে তিনি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পান। এই আয় দিয়ে তিনি পরিবার নিয়ে মোটামুটি ভালোভাবেই চলতে পারছেন।
কৃষি বিভাগের সহায়তা
বাঁশদহা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষিকর্মকর্তা কামরুল হাসান ডালিম জানান, এই ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে প্রায় ৬০ বিঘা জমিতে কুল চাষ হয়েছে। থাই কুল, আপেল কুল, নারিকেল কুল ও টক কুলের আবাদ বেশি। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মনির হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৮৪৪ হেক্টর জমিতে কুলের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি কুল উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে কুল বাজারে আসতে শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘সাতক্ষীরার নামের সঙ্গে কুলের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করে এবং জলবায়ু দুর্যোগপ্রবণ এই জেলায় কৃষকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরিতে কুল চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সাতক্ষীরার কুল রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
