
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফার্মেসি বিভাগে ঔষধ নিতে যাওয়া রোগী ও স্বজনদের কাছে বহুল প্রচলিত শব্দ। ডাক্তার দেখিয়ে হাসপতালের ফার্মেসিতে ঔষধ আনতে গিয়ে এই শব্দ শোনেননি এমন ব্যক্তি খুবই কম আছেন। অথচ সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ময়লার স্তুপে, কখনো স্টাফদের রুমে আবার কখনো স্টাফদের বাড়িতেও বস্তাভর্তি ঔষধ পাওয়া গেছে এমন ঘটনা সংবাদের শিরোনাম হয়েছে কয়েকবার।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে রবিবার (১৮ জানুয়ারি ) ভোর বেলায়। তবে ঘটনাটি কিছুটা ‘কোচো খুড়তে কেউটে’র মত অবস্থা।
ঘটনাটি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক পদে কর্মরত মো. শাহিনুর ইসলামের একটি অনৈতিক কর্মকান্ড ঘিরে।
জানা গেছে, ‘রবিবার ভোর বেলায় সাতক্ষীরা বাইপাস সড়কের পাশে খড়িবিলা সংলগ্ন এলাকায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক মো. শাহিনুর ইসলামের ভাড়া বাড়িতে তিন বস্তু সরকারি ঔষধ পাওয়া যায় এতে একপর্যায়ে উঠে আসে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট আক্তারুল ইসলাম ও গোলামের সরকারি ঔষধ বিক্রয়ের অভিযোগ উঠে এসেছে কয়েকজন যুবক সেই গন্তব্য লক্ষ করে মো. শাহিনুর ইসলামের ভাড়া বাড়িতে যায়। তবে শাহিনুরের ঘরের জ্বানালা দিয়ে ঘরের মেঝেসহ বিভিন্ন স্থানে সরকারি ঔষধের স্তুপ দেখে চোখ কপালে ওঠে ওই যুবকদের। পরে শাহিনুর ইসলাম ঘরের দরজা খুললে ভিতরে ঢুকে খাটের নীচে বস্তা ভর্তি আরও ঔষধের সন্ধায় পায় তারা।
এসময় শাহিনুর ইসলাম অবৈধভাবে সরকারি ঔষধ সংগ্রহের চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয়, তিনি আরও বলেন যে আমি তো চুনোপুঁটি আসল রাঘব বোয়ালদের আপনারা কিছু করতে পারেন না, ফার্মাসিস্ট থেকে না দিলে আমরা এতগুলো ঔষধ পায় কোথায় তার
ভাষ্যমতে, এই ঔষধকান্ডে ডাক্তার থেকে শুরু করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফার্মেসি বিভাগের প্রধান মো. গোলাম হোসেন, ফার্মেসি স্টাফ আক্তারুল ইসলামসহ অন্যান্য স্টাফদের জড়িত থাকার কথা জানা যায়।’
তবে ঔষধকান্ডে জড়ি থাকার কথা অস্বীকার করলেও কথার প্রেক্ষিতে বেরিয়ে পড়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফার্মেসি বিভাগে কর্মরত আক্তারুল ইসলামের বক্তব্যে জানা যায়, হাসপাতালে ডাক্তারদের সহকারী হিসেবে যেসব স্বেচ্ছাসেবক এবং আউটসোর্সিং স্টাফ আছেন তাদের অধিকাংশই ডাক্তার সিল ব্যবহার করে ডাক্তারের স্বাক্ষর নকল করে ঔষধ সংগ্রহ করেন স্টাফরা। তাদেরকে ঔষধ দিতে অস্বীকৃতি জানালে অনেকসময় ডাক্তারদের ফোন ধরিয়ে দেন সেসব স্টাফরা। ফলে ফার্মেসি বিভাগের কর্মচারীরা অসহায় হয়ে ঔষধ দিতে বাধ্য হন।’
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফার্মেসি বিভাগের ইনচার্জ মো. গোলাম হোসেন জানান, ‘ডাক্তারের স্লিপ ছাড়া তারা কাউকে ঔষধ দেন না। তবে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক মো. শাহিনুর ইসলামের ভাড়া বাড়িতে কীভাবে এত ঔষধ গেলো সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।’
ঔষধের সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক মো. শাহিনুর ইসলামের ভাড়া বাড়িতে পাওয়া ঔষধের ভিডিও দেখে তিনি দাবি করেন সেখানে সব ঔষধ সরকারি নয়।’
মো. গোলাম হোসেন আরও জানান, ‘আগামীতে যাতে হাসপাতালের কোন স্টাফ ঔষধ তুলতে না পারে সে বিষয়ে পরিচালক মহোদয়ের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে হাসপাতালের একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এই ঔষধকান্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত মো. শাহিনুর ইসলাম আরও বলেন আক্তার ভাই গোলাম স্যার এমন ঔষধ আমার মতো অনেক স্টাফ এর কাছে বিক্রয় করে থাকে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালক ডা. কুদরত-এ-খোদা’র হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এবং ফোন দিয়ে কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। এদিকে প্রচণ্ড শীতের প্রকোপে সাতক্ষীরায় গত এক মাসে ডায়রিয়ার আক্রান্ত হয়ে তিন শতাধিক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তীব্র শীতে উপকূলীয় এই জেলায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ছে।
সুন্দরবনঘেষা দেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে এবং গত এক মাসে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতাল এবং বিভিন্ন বেসরকারি তিন শতাধিকের বেশি ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশু চিকিৎসা নিয়েছে।
আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় তাপমাত্রার তারতম্য ঘটছে। এর ফলে এই জনপদের শিশুদের জীতজনিত রোগ দেখা দিচ্ছে।
শীতের তীব্রতার মধ্যে শিশুদের ঘরের বাইরে না নেয়া ও ফুটানো পানি পান ও শুষ্ক খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জুলফিকার হোসেন জানান, বিগত তিন-চার বছর সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এই অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেশি দেখা দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়ার কারণে মূলত আবহাওয়ার এতো বেশি পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমানে যে তাপমাত্রা বিরাজ করছে, সাতক্ষীরা অঞ্চলে আবারও শৈত্যপ্রবাহ আসবে। সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় তাপমাত্রার ব্যাপক তারতম ঘটছে। গত কয়েক বছর এই অঞ্চলে শীতের তীব্রতা তেমন লক্ষ্য করা না করা গেলেও গতবছরের মতো চলতি মৌসুমে শীতের তীব্রতা খুব বেশি অনুভূত হচ্ছে। তাপমাত্রা নিচে নেমে আসছে। যা জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব। পরিবেশ ঠিক রাখতে জনসাধারণকে সচেতন হতে হবে। প্রচন্ড ঠান্ডা থেকে নিরাপদ থাকতে পারিবারিকভাবে শিশু এবং বৃদ্ধদের বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।
সোমবার সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ড ঘুরে দেখা দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠাণ্ডাজনিত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করা হয়েছে। ডায়রিয়া ওয়ার্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১ ডিসেম্বর থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ২৫০টি শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে।
সদর উপজেলার ফিংড়ি গ্রামের হাসনা খাতুনের তিন মাস বয়সী শিশু সন্তান রনজিলা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। গত শুক্রবার তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই উপজেলার বলাডাঙ্গা গ্রামের রোজিনা আক্তার নয় মাস বয়সী শিশু সন্তান আলমগীর হোসেন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। গদাঘাটা গ্রামের রেশমা খাতুনের মেয়ে ফারিয়ার বয়স ১৪ মাস। সেও ডায়রিয়া আক্রান্ত।১৯ জানুয়ারি তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সদর হাসপাতালের চিকিৎসক রিয়াদ হাসান বলেন, প্রচণ্ড শীতে শিশুদের ঘরের বাইরে বের না করার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়াতে হবে। আক্রান্ত শিশুদের কাছাকাছি অন্য শিশুদের না থাকার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
বেসরকারি শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক আবুল বাসার জানান, কোল্ড ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। ১ ডিসেম্বর থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত শীতজনিত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১০২টি শিশু ভর্তি করা হয়েছে শিশু হাসপাতালে। চিকিৎসার পাশাপাশি শিশুদের ঠাণ্ডা না লাগানোর পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সামছুর রহমান বলেন, ‘শীতের তীব্রতা বাড়ায় শিশুদের বিভিন্ন শীতজনিত রোগ দেখা দিচ্ছে। শীতে অভিভাবক ও মায়েদের সতর্ক থাকতে হবে, শিশুদের ঠাণ্ডা লাগানো থেকে বিরত থাকতে হবে। ফুটানো পানি ও শুষ্ক খাবার খেতে দিতে হবে শিশুদের। শীত না কমা পর্যন্ত তাদের ঘরের বাইরে না যাওয়ারও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’
