
লবণাক্ততা, দারিদ্র্য ও জীবিকার টানাপোড়েনে নীরব সংগ্রাম
সিরাজুল ইসলাম : সাতক্ষীরা উপকূলের নারীদের জীবন যেন এক অবিরাম সংগ্রামের নাম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য এবং জীবিকার অনিশ্চয়তায় তাদের দৈনন্দিন জীবন হয়ে উঠেছে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। মৎস্যজীবী পরিবারের বড় অংশ নারী হলেও তাদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি নেই বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়রা বলছেন, উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা একদিকে সমাজের কুসংস্কার ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছেন, অন্যদিকে নিরাপদ পানির অভাব ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। লবণাক্ত পানির কারণে নানা শারীরিক জটিলতা তৈরি হলেও চিকিৎসা ও সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করছে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ পূর্ব কালিনগর এলাকার সাবিনা খাতুন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। তাঁর স্বামী সুন্দরবনকেন্দ্রিক জেলে হওয়ায় মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবারের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়।
সাবিনা বলেন, বনজীবীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলে ঘরে বসে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু সংসার ও ঋণের কিস্তির চাপ তাকে বাধ্য করে রোদে পুড়ে, জলে ভিজে ঘেরের কাজে নামতে। লবণাক্ত জমি ও কৃষিজমি কমে যাওয়ায় এখন বিকল্প কাজ বলতে কেবল শ্রমনির্ভর ঘেরই ভরসা।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ও কাঁকড়া আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকে। এই সময়গুলোতে পুরুষ বনজীবীরা কর্মহীন হয়ে পড়লে পরিবার চালানোর ভার পড়ে নারীদের ওপর। স্থানীয়দের মতে, এই সময়ে অনেক পরিবারই চরম অর্থকষ্টে পড়ে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা রেঞ্জে নিবন্ধিত প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালি থাকলেও এর বাইরে আরও দেড় লাখের বেশি মানুষ বননির্ভর জীবিকা চালায়। তবে নারীদের আলাদা কোনো স্বীকৃতি বা নিবন্ধন নেই।
স্থানীয় বনজীবীরা জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প কাজের সুযোগ না থাকায় অনেকেই ইটভাটা বা শহরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন। কেউ কেউ নারীদের কাজে পাঠান সংসার চালানোর জন্য।
গবেষকদের মতে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আবাদি জমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উপকূলীয় মানুষের জীবিকা আরও সংকুচিত হয়েছে। ফলে নারীরাই এখন পরিবারের প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠছেন।
সুন্দরবন গবেষক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, বননির্ভর পরিবারগুলোর জন্য বছরে দুই দফা নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব তৈরি করে। এই সময় নারীরাই বহুমুখী কাজে যুক্ত হয়ে পরিবার টিকিয়ে রাখেন, তবে এ কাজের কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই।
মানবাধিকারকর্মী মাধব দত্ত বলেন, নারীদের কম মজুরির কারণে মালিকপক্ষ তাদের কাজে নিতে আগ্রহী হয়, যা এক ধরনের শ্রম শোষণ তৈরি করছে। তাঁর মতে, শুধু খাদ্য সহায়তা নয়, নগদ অর্থসহ সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন।
স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠনের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পুরুষরা কর্মসংস্থানের জন্য দীর্ঘ সময় বাইরে থাকায় পরিবারগুলো অনেকাংশে নারীনির্ভর হয়ে পড়ছে। জীবিকার চাপে নারীরা এখন মাছ ধরা, কাঁকড়া ধরা থেকে শুরু করে কঠিন শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান জানান, বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তবে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এককভাবে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়।
জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য ও জীবিকার সংকটে উপকূলের নারীদের জীবন প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে—এই নীরব কষ্টের অবসান আদৌ কবে হবে?
