
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : লবণাক্ত মাটির কারণে সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অভাব-অনটনে দিন কাটিয়েছে। পুরুষেরা ইটভাটা, রিকশা চালানো ও দিনমজুরের কাজ করতে দূরাঞ্চলে ছুটে যেতেন। ঘরে থাকা নারীরা পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনে স্বামীদের ফেরার অপেক্ষাতেই থেকেছেন বছরের পর বছর। উপকূলের ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সেই জীবনকে আরও সংকটময় করেছে।
কিন্তু এখন দৃশ্যপট পাল্টাচ্ছে। ছাগল–ভেড়া পালন ও শাকসবজি চাষে ঘুরে দাঁড়ানো শুরু করেছেন উপকূলের প্রান্তিক নারীরা। বদলে যাচ্ছে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থান।
ফ্রেন্ডশিপের সহায়তায় নারীদের স্বাবলম্বন
অলাভজনক উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের ট্রানজিশন ফান্ড (এএসডি) প্রকল্পের মাধ্যমে শ্যামনগরের পদ্মপুকুর, ঝাপা, সোনাখালী, চন্ডিপুর, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন এবং আশাশুনির বেশ কিছু গ্রামে নারীদের দেওয়া হচ্ছে ছাগল, ভেড়া, মৌসুমি সবজি বীজ ও প্রশিক্ষণ। এতে নারীরা ঘরের আঙিনাতেই চাষাবাদ ও পশুপালন শুরু করে নিজেদের আয়–রোজগারের পথ তৈরি করছেন।
সোনাখালী গ্রামের পুতুল রানী জানান, ‘আগে পুরোপুরি স্বামীর উপার্জনের ওপর নির্ভর করতে হতো। সবজি চাষ করে গত বর্ষায় ১৪ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করেছি। এখন সন্তানদের লেখাপড়ার কিছু খরচও নিজে বহন করতে পারি।’
পাতাখালীর সুফিয়া খাতুন আরও এগিয়ে। ‘ছাগল পালন শুরু করে এখন আমি ১৪টি ছাগলের মালিক হয়েছিলাম। সেখান থেকে চারটি বিক্রি করে নরম কাঁকড়া উৎপাদনের পয়েন্ট করেছি। স্বামী–ছেলেকে আর সুন্দরবন বা ইটভাটায় যেতে হয় না,’ বললেন তিনি।
সরকারি সংস্থার কারিগরি সহায়তা
শ্যামনগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের ইনচার্জ মাহবুর রহমান বলেন, ‘নারীরা বিনা মূল্যে ছাগল–ভেড়া ও হাঁস পাচ্ছেন। আধুনিক পদ্ধতিতে পালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, ‘লবণাক্ত এলাকায় লবণসহনশীল জাতের সবজি বীজ প্রদান ও আধুনিক চাষপদ্ধতির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’
ফ্রেন্ডশিপের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘দুই বছর ধরে একটি পরিবারকে নিবিড়ভাবে সহায়তা করি। অনেক নারী এখন পুরোপুরি স্বাবলম্বী।’
শ্যামনগরের হাটছালা গ্রামে কয়েক দশক আগে বর্ষাকাল ছাড়া কিছুই ফলত না। সেই গ্রামেই এখন সারা বছর নানা সবজির চাষ হয়। প্রায় ১০০ পরিবার চাষাবাদ করে বছরে উৎপাদন করছে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার সবজি। স্বল্প জমি, কম খরচ ও বিষমুক্ত পদ্ধতিতে চাষ হওয়ায় এলাকায় তৈরি হয়েছে টেকসই কৃষির মডেল।
৩০ বছর আগে বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ শুরু করেছিলেন মনোতোষ মণ্ডল। ফেরিওয়ালার জীবন থেকে উঠে আজ তিনি ৮০ শতাংশ জমির মালিক। তাঁর মতোই বহু পরিবার ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন সবজি চাষে।
হাটছালায় এখন নিজেরা তৈরি করা গ্রিনহাউসের আদলে প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা জমিতে উৎপাদিত হচ্ছে বোম্বাই মরিচ, টমেটো, কাঁচা মরিচ, পালংশাক, ফুলকপি–বাঁধাকপি, লালশাকসহ নানা সবজি। কৃষক প্রদীপ মণ্ডল জানান, দুই বিঘা জমিতে সবজি চাষ করে গত শীতে আয় করেছেন প্রায় তিন লাখ টাকা।
নারীরাও এখন পুরুষের সঙ্গে সমান তালে কাজ করছেন—ক্ষেত পরিচর্যা, বাজারজাতকরণ, নতুন জমি তৈরি—সব ক্ষেত্রেই নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি।
সেচসংকটে উদ্বেগ
সবজিচাষে সফল হলেও বড় চ্যালেঞ্জ সেচের পানি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ও পাশের গ্রাম থেকে পানি কিনে চাষাবাদ করতে হয়। মনোতোষসহ স্থানীয় কৃষকদের দাবি—‘সেচব্যবস্থা হলে ফলন হবে দ্বিগুণ।’
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, ‘হাটছালা গ্রামের উৎপাদন বছরে প্রায় ১,৩৮৪ মেট্রিক টন। বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’
সবজি চাষ ও পশুপালনের হাত ধরেই সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে জীবিকার নতুন দিগন্ত তৈরি হয়েছে। যেখানে কখনো অপেক্ষা আর অভাব ছাড়া কিছুই ছিল না, সেখানে আজ নারীদের হাতেই পরিবারের অর্থনীতির চাবিকাঠি।
স্বামী–সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি পেয়েছেন প্রান্তিক নারীরা; একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে স্থায়ী আয়, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা।
উপকূলের নারীদের এই অগ্রযাত্রা এখন পুরো অঞ্চলের বদলে যাওয়ার গল্প।
