
মো. ওমর ফারুক, রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) : লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে অতিথি আপ্যায়ন কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠান—মহিষের দই ছাড়া যেন কোনো আয়োজনই পূর্ণতা পায় না। প্রায় দুই শতাব্দীর পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য এখন স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুস্বাদু খাবার হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। স্বাদ, ঘনত্ব ও পুষ্টিগুণের কারণে জনপ্রিয় এই দই এখন একটি বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, রায়পুরকেন্দ্রিক এলাকায় প্রতিদিন তিন টনের বেশি মহিষের দই উৎপাদিত হচ্ছে। বছরে উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮০ টন, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
যেভাবে তৈরি হয় এই দই মেঘনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল—যেমন কানিবগারচর, চরকাছিয়া, চর ইন্দুরিয়া, টুনুরচর ও মিতালী বাজারের বিভিন্ন বাথান থেকে প্রতিদিন সংগ্রহ করা হয় কাঁচা মহিষের দুধ। স্থানীয়ভাবে ‘টালি’ নামে পরিচিত মাটির বিশেষ পাত্রে এই দুধ ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা রেখে প্রাকৃতিকভাবে দই জমানো হয়। বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়ায় কোনো প্রকার সংরক্ষণাগার ছাড়াই এই দই প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত খাওয়ার উপযোগী থাকে। প্রতি লিটার দুধ থেকে প্রায় ৯৫০ গ্রাম দই পাওয়া যায়।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও জনপ্রিয়তা বর্তমানে প্রতি কেজি মহিষের দই প্রায় ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রায়পুর ও এর আশপাশের অন্তত ৪০টি বাজারে প্রতিদিন ১০ টনের বেশি দই বিক্রি হয়, যা থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী হোসেন বলেন, “বিয়ের অনুষ্ঠানে মহিষের দই না থাকলে আয়োজন যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমাদের এখানে এটি এখন সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।”
চ্যালেঞ্জের মুখে ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রাখলেও বর্তমানে মহিষের দুধ উৎপাদন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চরাঞ্চলে জনবসতি বৃদ্ধি, চারণভূমি সংকুচিত হওয়া এবং কৃষিজমি সম্প্রসারণের কারণে মহিষ পালন দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় প্রায় ২০ হাজার মহিষ থাকলেও স্থানীয় খামারিদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর প্রায় দ্বিগুণ।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. যোবায়ের হোসেন বলেন, “মহিষের দই অত্যন্ত পুষ্টিকর ও জনপ্রিয় একটি পণ্য। উৎপাদন বৃদ্ধি ও খামারিদের সহায়তায় আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করছি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, চারণভূমি সংরক্ষণ এবং উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে রায়পুরের এই ঐতিহ্যবাহী মহিষের দই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিতে পারে।
