ভেনামি চিংড়ি চাষে সাফল্য, রেণু সংকটে পড়ছেন সাধারণ চাষিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : দেশে ভেনামি পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণের ফলে চিংড়ি খাতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হলেও রেণু সংকটে পড়ছেন সাধারণ বাগদা চিংড়ি চাষিরা। ভেনামি চিংড়ির রেণুর চাহিদা বাড়ায় দেশে প্রচলিত বাগদা চিংড়ির রেণু উৎপাদন ও সরবরাহে বিলম্ব দেখা দিচ্ছে। এতে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও কক্সবাজারের চাষিরা বিপাকে পড়ছেন।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, শুধু সাতক্ষীরাতেই বছরে প্রায় ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ কোটি রেণু পোনার প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ রেণু আসে কক্সবাজার থেকে এবং বাকি ২৫ শতাংশ স্থানীয় হ্যাচারি ও নদী থেকে সংগ্রহ করা হয়। তবে ভেনামি চিংড়ি চাষ বাড়ায় মাদার চিংড়ির সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে ২০২৬ সালে রেণু বাজারে আসতে বিলম্ব হতে পারে।

১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা একটি মা ভেনামি চিংড়ির দাম কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা। যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ড থেকে এসব মা চিংড়ি আমদানি করা হয়। একটি মা ভেনামি চিংড়ি থেকেই বছরে ১০ লাখ পর্যন্ত রেণু উৎপাদন সম্ভব।

বিশ্ববাজারে চিংড়ির বড় অংশ জুড়ে আছে লিটোপেনিয়াস ভাননামি বা ভেনামি চিংড়ি। বাগদা ও গলদা চিংড়ির তুলনায় এটি দ্রুত বড় হয়, রোগবালাই কম এবং উৎপাদন বেশি। পোনা ছাড়ার ১১০ দিনের মধ্যে ভেনামি চিংড়ি ৩৫–৪০ গ্রাম ওজনের হয়, যেখানে বাগদা চিংড়ির ক্ষেত্রে সময় লাগে প্রায় ১৫০ দিন।

বর্তমানে প্রতি কেজি ভেনামি চিংড়ি দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬০০–৭০০ টাকায়। আর বাগদা চিংড়ির দাম ৭০০–৮০০ টাকা।

কক্সবাজারে সরকার অনুমোদিত দুটি হ্যাচারিতে—নিরিবিলি ফিশারিজ লিমিটেড ও দেশ বাংলা হ্যাচারিতে—ভেনামি চিংড়ির পোনা উৎপাদন হচ্ছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে এসব হ্যাচারি বাজারে পোনা সরবরাহ শুরু করে। বর্তমানে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অন্তত ৫০০ খামারে ভেনামি চিংড়ির চাষ হচ্ছে।

নিরিবিলি হ্যাচারির মহাব্যবস্থাপক সুজন বড়ুয়া বলেন, “থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা একটি মা ভেনামি চিংড়ি থেকে ১০ লাখের বেশি পোনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রায় ৬ লাখ পোনা বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব।” তিনি জানান, ২০২৬ সালে ২ হাজার মা চিংড়ি আমদানি করে অন্তত ৬০ কোটি পোনা উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি অনুমোদন ছাড়া কিছু হ্যাচারিতে ভেনামি পোনার নামে নিম্নমানের পোনা উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। এতে বাজারে পোনার দাম কমে গেছে ১০–১৫ পয়সা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বৈধ হ্যাচারি মালিক ও খামারিরা।

উখিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল হক বলেন, “ভেনামি পোনা উৎপাদনের অনুমোদন শুধু দুটি হ্যাচারির রয়েছে। অন্য কোথাও এটির উৎপাদন নিষিদ্ধ।” তিনি জানান, অবৈধ উৎপাদনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

চকরিয়ার ইলিশিয়ায় তিন একরের একটি খামারে ভেনামি চিংড়ি চাষ করছেন রিমন চৌধুরী। তিনি বলেন, “৬০ দিনের মাথায় চিংড়ির ওজন ১০ গ্রাম হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”
খামারিরা জানান, ভেনামি চিংড়ি ৮ গ্রাম ওজন থেকেই বিক্রি করা যায়, যা বাগদার ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ভেনামি চিংড়ির বিস্তার হলে বাগদা চিংড়ির রেণু সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তবে যথাযথ তদারকি ও অনুমোদনের আওতায় চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি আয় কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।