বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার ‘বুননশিল্পী’ বাবুই ও ঐতিহ্যবাহী তালগাছ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

সিরাজুল ইসলাম : ‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই। আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকার পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ-বৃষ্টি ঝড়ে।’—কবি রজনীকান্ত সেনের এই অমর কবিতার বাবুই পাখির নিপুণ বাসা তৈরির দৃশ্য এখন কেবল পাঠ্যপুস্তকের পাতাতেই সীমাবদ্ধ। যান্ত্রিকতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যবাহী পাখি ও তার শৈল্পিক বাসা আজ বিলুপ্তির পথে।

একসময় গ্রাম-বাংলার প্রতিটি জনপদ মুখরিত থাকতো বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দে। সারি সারি উঁচু তালগাছ ছিল তাদের নিরাপদ আবাসন। তালপাতার বুননে তৈরি বাবুইয়ের বাসা যেমন আকর্ষণীয় ছিল, তেমনি ছিল প্রবল ঝড়েও টিকে থাকার মতো মজবুত। কিন্তু বর্তমানে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছ। আশ্রয় হারিয়ে বাবুই পাখিও এখন আর আগের মতো দেখা যায় না।

প্রাণীবিদদের মতে, তালগাছ এবং বাবুই পাখি যেন একই সুতোয় গাঁথা। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আবাসস্থল সংকটে পড়েছে এই বুননশিল্পী। এছাড়াও কৃষিকাজে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার এবং শিকারিদের দৌরাত্ম্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা জানান, বন্যপ্রাণী মানুষের কোলাহল থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করে। কিন্তু গ্রামগঞ্জে বড় বড় গাছপালা কেটে বসতি তৈরির ফলে পাখিরা তাদের নিরাপদ আশ্রয় হারিয়ে ফেলছে। পুরুষ বাবুই পাখি এক মৌসুমে প্রায় ৬টি পর্যন্ত বাসা তৈরি করতে পারে। আমন ধান পাকার মৌসুমে তারা তাল ও খেজুর গাছের ডালে বাসা বাঁধে। অথচ সেই গাছগুলোই এখন আর পর্যাপ্ত নেই।

সংকট উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা রাস্তার ধারে বা পতিত জমিতে তাল, খেজুর ও নারিকেল গাছ রোপণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের মতে, যদি পরিকল্পিতভাবে তালগাছ রোপণ এবং পাখি শিকার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো বাবুই পাখির নিপুণ শিল্পের গল্প কেবল বইয়ের পাতাতেই পড়বে, বাস্তবে দেখার সুযোগ পাবে না।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিই এখন সময়ের দাবি।