
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা: আধুনিক পদ্ধতিতে কার্প জাতীয় সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদন করে রীতিমতো সাড়া ফেলেছেন জেলার তালা উপজেলার মৎস্য উদ্যোক্তা রেখা রাণী মণ্ডল। সংসারের শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজের লালিত স্বপ্নকে ফিকে হতে দেননি তিনি। রান্নাঘরের কাজের পাশাপাশি পুকুরপাড়ের সব দায়িত্ব সমানতালে সামলে গড়ে তুলেছেন সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদনের একটি সফল খামার।
দৃঢ় প্রত্যয়, কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির বলে ৩৯ বছর বয়সী রেখা রাণী মণ্ডল আজ এলাকায় একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর দেখাদেখি এবং অনুপ্রেরণায় তালা উপজেলায় অর্ধশতাধিক মৎস্যচাষি এখন মাছের পোনা উৎপাদন করে সাফল্যের মুখ দেখছেন। বেসরকারি সংস্থা ‘সাতক্ষীরা উন্নয়ন সংস্থা’ (সাস)-এর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করছেন। মাছ চাষ সম্পর্কে আগে তেমন কোনো ধারণা না থাকলেও সাসের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর থেকেই তাঁদের জীবনযাত্রার মান বদলে যেতে শুরু করে।
বর্তমানে রেখা রাণী মণ্ডল তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের বয়ারসিং গ্রামে দুই বিঘা জমিতে সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদন করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শুধু নিজে স্বাবলম্বী হওয়াই নয়, তাঁর খামার ও পরামর্শ নিয়ে এলাকার আরও অনেক নারী ও পুরুষ নতুন করে মাছ চাষ শুরু করেছেন। স্থানীয় মাছ চাষিরা এখন দূরদূরান্তে না গিয়ে তাঁর খামার থেকেই মাছের চারা বা রেণু সংগ্রহ করছেন।
বাসসের সঙ্গে আলাপকালে রেখা রাণী মণ্ডল জানান, আগে তিনি নিয়ম মেনে মাছ চাষ করতে পারতেন না। কিন্তু সাসের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর দুই বিঘা জমিতে সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদন শুরু করার পর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন তিনি খামারের পাশাপাশি সংসারে স্বামীর পাশাপাশি বড় ধরনের অর্থনৈতিক অবদান রাখছেন। এমনকি দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর এই সফলতার পেছনে স্বামী মনোরঞ্জন মণ্ডলের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা রয়েছে বলে তিনি জানান।
রেখার স্বামী মনোরঞ্জন মণ্ডল বলেন, মাছ উৎপাদনের খামারে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সমানভাবে ও অক্লান্ত পরিশ্রম করেন বলেই আজ তাঁরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পেরেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা পূজা রাণী মণ্ডল জানান, রেখা রাণীর কাছ থেকে পরামর্শ ও উৎসাহ পেয়ে তিনিও সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদন শুরু করেছেন। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেও জানা গেছে, রেখার সফলতার পথ অনুসরণ করে অনেকেই এখন খামার তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছেন।
স্থানীয় মাছের ব্যবসায়ীরা জানান, অতীতে ভালো মানের রেণু পোনা কেনার জন্য তাঁদের যশোরসহ অন্যান্য জেলায় যেতে হতো। এতে যাতায়াত খরচ ও সময় যেমন বেশি লাগত, তেমনি পথিমধ্যে মাছ মরে যাওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকিও থাকত। এখন নিজ এলাকার খামার থেকেই সহজেই মানসম্মত রেণু পোনা পাওয়া যাওয়ায় তাঁদের সময়, অর্থ এবং পরিবহনজনিত ঝুঁকি—সবকিছুই অনেকাংশে কমে গেছে।
রেখা রাণীর খামার পরিদর্শনে আসা স্থানীয় যুবক রেজাউল ইসলাম মুগ্ধতা প্রকাশ করে জানান, তিনি খামারটি দেখে দারুণ অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তিনিও রেখার পরামর্শ নিয়ে আগামীতে নিজে একটি সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদনের খামার গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
সাতক্ষীরা উন্নয়ন সংস্থা (সাস)-এর এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট অফিসার মো. ইকরামুল হাসান জানান, সংস্থার এই প্রকল্পের আওতায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে মৎস্যচাষিদের দক্ষ করে তোলা হয়। এর ফলে তারা যেমন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, তেমনি এলাকায় মানসম্মত মাছের চারা সরবরাহ করে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করছেন।
সাসের নির্বাহী পরিচালক শেখ ইমান আলী বাসসকে বলেন, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহযোগিতায় পরিচালিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তার ফলে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় কার্প জাতীয় সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদনে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় মাছের চাহিদা মিটছে, অন্যদিকে গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয় বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার পথ সুগম হচ্ছে।
তালা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. তারিক ইমাম বলেন, রেখা রাণীর সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদনের এই উদ্যোগ পুরো এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আশপাশের মৎস্যচাষিরা এখন খুব সহজেই নিজ এলাকা থেকে উন্নত জাতের মাছের পোনা সংগ্রহ করতে পারছেন। রেখা রাণীসহ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অন্যান্য উদ্যোক্তারাও তালা উপজেলার সামগ্রিক মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন।
তিনি আরও বলেন, একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা রেখা রাণী মণ্ডলের এই সংগ্রামী পথচলা এটিই প্রমাণ করে যে, সঠিক প্রশিক্ষণ ও সদিচ্ছা থাকলে নারীরাও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন।
