
সিরাজুল ইসলাম শ্যামনগর সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
হাতি বাঁচলে লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা। প্রচলিত এই প্রবাদটি এখন পুরনো হয়ে গেছে।
হাতির পরিবর্তে বাঘের বেলায় এখন এটি প্রযোজ্য হচ্ছে। তবে লাখ টাকা নয়, কোটি টাকা।
বাঘ বাঁচলেও কোটি টাকা, মরলেও কোটি টাকা।
এক শ্রেণীর শিকারি খাদ্যে বিষ মিশিয়ে ফাঁদ পেতে, বন্দুক দিয়ে গুলি করে সুন্দরবনের বাঘ শিকার করে পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করেন।
পাচারকারীরা আন্তর্জাতিক চোরাই বাজারে সে চামড়া বিক্রি করেন কোটি টাকায়। চামড়া তো বটেই, সেই সঙ্গে বাঘের নখ থেকে শুরু করে হাড়, এমনকি মুখের গোঁফ সবই আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক দামি।
যার কারণে সুন্দরবনকে ঘিরে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বাঘ পাচারকারী চক্র। তারা অবাধে বাঘ শিকার করে পাচার করছে অঙ্গ-প্রতঙ্গ। এর বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। মূলত বন্য প্রাণী সংরক্ষণে কঠিন আইন না থাকার সুযোগ নিচ্ছে এ চক্রের সদস্যরা। অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়লেও আইনি দুর্বলতায় অভিযুক্তরা বার বার বেরিয়ে গিয়ে পুনরায় একই অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাঘ পাচার সুন্দরবন এলাকায় এখন একটি লাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে। মাছ ধরার জাল বিছিয়ে, নাইলনের রশি দিয়ে তৈরি ফাঁস, স্প্রিং বসানো বিশেষ ফাঁদ, কলার মধ্যে বিষ দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা ফাঁদ, বড়শিতে বিশ মেশানো খাবার দিয়ে শিকারিরা বাঘ ও হরিণ শিকার করছে। এসব ফাঁদে বাঘ ও হরিণ আটকা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আশপাশে লুকিয়ে থাকা শিকারীরা আঘাত দিয়ে ও গুলি করে সুবিধা মতো জায়গায় নিয়ে যায়। বাঘ হত্যার পর গর্ত করে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়। এর আগে চামড়া ও মাংস খুলে সেগুলো পাচার করা হয়। দীর্ঘ দিন মাটির নিচে থাকার পর হাড়গুলো মাংস ও রক্ত থেকে আলাদা হলে মাটি থেকে তুলে পাচারের জন্য নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে সুন্দরবনের অংশকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ ও অপরটি সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ।
সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের তথ্য মতে, ২০০১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে মোট ৪১টি বাঘ শিকারিদের হাতে হত্যা, লোকালয়ে প্রবেশে গণপিটুনি ও বার্ধক্য জনিত কারণে মারা যায়।
এ প্রসঙ্গে সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী নুরুল করিম বলেন, ২০০১ সালে বার্ধক্যজনিত কারণে ২টি, ২০০২ সালে শিকারিদের হাতে ১টি, ২০০৩ সালে লোকালয়ে প্রবেশের সময় গণপিটুনিতে ৩টি, ২০০৪ সালে শিকারিদের হাতে ১টি, ২০০৫ সালে বার্ধক্য জনিত কারণে ১টি, ২০০৬ সালে শিকারিদের হাতে ১টি, ২০০৭ সালে ২টি (বার্ধক্য ১টি ও সিডরে ১টি), ২০০৯ সালে লোকালয়ে প্রবেশের সময় গণপিটুনিতে ১টি, ২০১১ সালে শিকারিদের হাতে ৪টি, ২০১২ সালে শিকারিদের হাতে ১টি, ২০১৫ সালে শিকারিদের হাতে ২টি বাঘের মৃত্যু হয়।
তবে ২০০৮, ২০১০, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে কোনো বাঘ হত্যার খবর বনবিভাগের কাছে নেই।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী নজরুল করিম বলেন, ২০০১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৯টি বাঘ লোকালয়ে প্রবেশের সময় গণপিটুনিতে, ৬টি বাঘ বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যায়। ২০১৪ সালে ২টি ও ২০১৫ সালে শিকারিদের হাতে ৫টি বাঘ হত্যা হয়।
বাঘের চামড়া কোথায় পাচার হয়- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়াসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশে বাঘের চামড়া, মাংস, হাড় ও অঙ্গ-প্রতঙ্গ পাচার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধারকৃত চামড়া কি করা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী উদ্ধারকৃত চামড়া বিভিন্ন স্থানে হস্তান্তর করা হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গত ৫-৬ মাস আগে দুটি চামড়া ঢাকা জাদুঘরে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পাচার প্রসঙ্গে একটি সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক চোরাই বাজারে চীনসহ বিভিন্ন দেশে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনাবেচা হয়। ওই বাজারে আমাদের দেশ থেকে পাচার হয় বাঘের হাড়-চামড়া। প্রায় ২ হাজার ৩০০শ’ বছর থেকে ঐতিহ্যবাহী চীনা টোটকা চিকিৎসায় বাঘের অঙ্গ-প্রতঙ্গের ব্যবহার হয়ে আসছে। মানব শরীরের চিকিৎসায় ওষুধ বানাতে ব্যবহার হয় বাঘ। চীনের মতো একই বিশ্বাস রয়েছে হংকং, জাপান, কোরিয়া এবং তাইওয়ানে। যার কারণে সেখানেও বাঘের অঙ্গ-প্রতঙ্গের কদর রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের সুন্দরবনের বাঘের চামড়ার ওপর আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের লোভ বেশী। তারা এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চামড়ার জন্য রীতিমত বিনিয়োগ করে শিকারি ও এ দেশের চোরাকারবারিদের কাছে।
এনভায়রনমেন্ট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি বা সংক্ষেপে ইআইএ’র তথ্য মতে, বিশ্বে বাঘের বিভিন্ন অংঙ্গ-প্রতঙ্গের জন্য প্রতিদিন একটি করে বাঘ হত্যা করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এক কেজি বাঘের হাড়ের গুঁড়ো প্রায় এক হাজার ৭০০ ডলার বা লাখ টাকার বেশি দরে বিক্রি হয়।
বাঘের চামড়া ও হাড় পাচারের সঙ্গে খুলনাসহ রাজধানী ঢাকার শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে।
এই সিন্ডিকেটটি চীন-ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বাঘের চামড়া ও হাড় পাচার করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বনদস্যু, মাছ ও কাঁকড়া শিকারের নামে এক শ্রেণীর বনজীবীকে দিয়ে বাঘ শিকার করানো হচ্ছে। বাঘ শিকার বন্ধে এবং অস্তিত্ব সংকটে পড়া বাঘ রক্ষায় অবিলম্বে সুন্দরবনে সব ধরনের বনজীবী প্রবেশ বন্ধ করার বিকল্প নেই বলে পরিবেশবিদরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
এ প্রসঙ্গে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ বলেন, বনরক্ষীদের কাছে যে অস্ত্র আছে, তা দিয়ে বন দূরে থাক, তারা নিজেদেরই রক্ষা করতে পারে না।
তিনি আরো বলেন, আইনানুযায়ী খুলনায় বন আদালত থাকার কথা থাকলেও তা নেই। অন্য আদালতে বন মামলা পরিচালনা করতে হয়। ফলে অন্য মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে বন মামলার গুরুত্ব কমে যায়। এতে অপরাধীরা বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
এছাড়া তিনি খুলনায় বন আদালত স্থাপন ও সুন্দরবন রক্ষায় বনে সব ধরনের সম্পদ আহরণের পারমিট প্রদান বন্ধের দাবি জানান।
র্যাব-৬’র সদর দফতর খুলনার স্কোয়াড্রন লিডার নিয়াজ মোহাম্মদ ফয়সাল এই প্রতিবেদককে বলেন, বাঘ শিকার বন্ধে র্যাব-৬ সাড়াশি অভিযান চালাবে। যে কোন মূল্যে সুন্দরবনকে সুরক্ষার জন্য র্যাব-৬ অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
খুলনার খুলনার বোন সংরক্ষক মিহির কান্তি দেবলেন, সুন্দরবনকে ঘিরে যেসব অপরাধী চক্র তাদের অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে বনদস্যু, জলদস্যু, বাঘশিকারিদের ধরতে শীঘ্রই অভিযান চালানো হবে। এক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে র্যাব, কোস্ট গার্ড, বিজিবি সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
তিনি আরো বলেন, বাঘের চামড়া ও হাড় পাচার সিন্ডিকেটের মূলহোতাদের কোন ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের ধরার জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
