জলবায়ুর প্রভাবে স্বাস্থ্য, খাদ্য ও নিরাপত্তায় চরম ঝুঁকি

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এক গভীর সংকটে পড়েছে। স্বাস্থ্য, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, বসতি ও যাতায়াত—সব খাতেই দেখা দিয়েছে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’-এর আঘাতে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও ভোলাসহ উপকূলের জেলার হাজারো মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
উপকূলের নদীগুলো জোয়ার-ভাটার কারণে প্রতিদিন নতুন সংকটের মুখে পড়ছে। সাগরের অতিরিক্ত জোয়ার ও লবণাক্ত পানির কারণে কৃষি ও পানীয় জলের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এক গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত কয়েক বছরে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। লবণাক্ত পানি পান করে নারী ও শিশুরা কিডনি, চর্ম ও প্রজননজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ ও সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলের ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন, আর ৪৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ মানুষের ঘুমের সমস্যা রয়েছে। গবেষণাটি খুলনার শ্যামনগর এলাকায় পরিচালিত হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব মানুষের মানসিক অবস্থাকেও বিপর্যস্ত করছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, “উপকূলের মানুষের জীবনে জলবায়ু পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব ফেলছে। নিয়মিতভাবে তাদের পাশে থেকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো জরুরি।”
ষাটের দশকে উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্পের আওতায় ৩৯টি পোল্ডার ও ২৮২টি স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে নদীগুলো প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে জোয়ারবাহিত পলি নদীতেই জমে নাব্যতা নষ্ট হচ্ছে। নদী রক্ষা কার্যক্রম (টিআরএম) কিছু এলাকায় সফলতা দেখালেও তা এখন স্থবির। ফলে আবারও জলাবদ্ধতা বাড়ছে, নদী হারাচ্ছে প্রাণ।
গবেষকেরা বলছেন, উপকূলীয় মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিশেষ কাউন্সেলিং ইউনিট গঠন এবং জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় (ন্যাপ) স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ডা. ড্যানিয়েল নোভাক বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের মনস্তত্ত্বেও গভীর প্রভাব ফেলছে। এটি এখন বৈশ্বিক সংকট।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল রক্ষায় নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ পুনরুদ্ধারই একমাত্র সমাধান। না হলে এ অঞ্চলের জনজীবন, কৃষি, প্রকৃতি ও সভ্যতা চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
