
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : কলসি হাতে পানি আনতে যাচ্ছে দুই শিশু। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, নিত্যদিনের সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু বাস্তবে এই দৃশ্যই সাতক্ষীরার উপকূলীয় আদিবাসী মুন্ডা শিশুদের জীবনের নির্মম বাস্তবতা। পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে স্কুলে যাওয়া হয় না তাদের। অনেকেই একপর্যায়ে ঝরে পড়ে শিক্ষার মূলধারা থেকে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে ১৫ বছর বয়সী অতসী মুন্ডার। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ভেটখালীর মুন্ডাপাড়ায় তার বাড়ি। প্রতিদিনই তাকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে খাবার ও রান্নার পানি আনতে যেতে হয় ভেটখালি বাজার কিংবা আশপাশের গ্রামে। এতে সময় লাগে দুই ঘণ্টার বেশি। খরার সময় এই সময় আরও বেড়ে যায়।
অতসী বলে, ‘সকালে উঠেই জল আনতে যাই। জল না আনলে রান্না হবে না। স্কুলে যাওয়ার কথা মনে থাকলেও জল আনতেই দিন শেষ হয়ে যায়।’
অতসীর বাবা অসুস্থ, মা দিনমজুর। পরিবারের দায়িত্ব ছোটবেলা থেকেই তার কাঁধে। পড়াশোনার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবতা তাকে টেনে নামিয়েছে পানির খোঁজে। অতসীর গল্প একার নয়—শ্যামনগরের প্রায় সব মুন্ডা শিশুর গল্পই এমন।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ২২টি গ্রামে প্রায় ৪৫০টি মুন্ডা পরিবার বসবাস করে। সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থার (সামস) তথ্যমতে, ব্রিটিশ আমলে ঝাড়খণ্ড অঞ্চল থেকে এই জনগোষ্ঠীকে এখানে আনা হয়। একসময় নিজেদের জমি থাকলেও এখন তাদের ৯৫ শতাংশই ভূমিহীন। দিনমজুরিই প্রধান আয়ের উৎস।
প্রতিটি মুন্ডা পরিবারে নারী-পুরুষ কাজ করেন বাইরে। ফলে পানি আনা, ঘর সামলানোসহ নানা দায়িত্ব পড়ে শিশু ও কিশোরদের ওপর। খরার মৌসুমে এই চাপ দ্বিগুণ হয়। অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে পানি কিনে খেতে হয়। ২০ লিটার পানির ড্রামের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা। মাসে শুধু পানির পেছনেই খরচ হয় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা—যা দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বড় বোঝা।
সজনী মুন্ডা জানায়, ‘মাসে হাজার টাকার মতো শুধু পানির পেছনে চলে যায়। তখন পড়াশোনার খরচ তো ভাবাই যায় না।’
উপকূলীয় সাতক্ষীরায় অগ্রহায়ণ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত তীব্র পানির সংকট থাকে। আশপাশের পুকুরগুলো শুকিয়ে যায় কিংবা লবণাক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৮০-এর দশকে অপরিকল্পিত চিংড়িঘের বিস্তারের ফলে এই সংকট শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা এবং সাম্প্রতিক আম্ফান ও বুলবুল ঘূর্ণিঝড়ে বাঁধ ভেঙে গ্রামে গ্রামে লবণাক্ত পানি ঢুকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তোলে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী, শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় ৭৩ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ লবণাক্ত পানি পান করছে। এ অঞ্চলের ৫২ শতাংশ পুকুর ও ৭৭ শতাংশ নলকূপের পানি পানের অনুপযোগী।
ভেটখালীর ৯৩ নম্বর নতুনঘেরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শর্বাণী বিশ্বাস বলেন, ‘খরার সময় মুন্ডা শিশুরা নিয়মিত স্কুলে আসতে পারে না। প্রতি বছর চার-পাঁচজন শিশু ঝরে পড়ে।’
মাধ্যমিক পর্যায়েও একই চিত্র। ধুমঘাটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অভিজিৎ কুমার মণ্ডল জানান, সপ্তম শ্রেণিতে যেখানে ৫০–৬০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি থাকে, দশম শ্রেণিতে টিকে থাকে মাত্র ১০–১২ জন। তাদের স্কুল থেকে এবারই প্রথম একজন মুন্ডা শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে।
পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। ভেটখালীর কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী আবু নূর জানান, ডায়রিয়া, আমাশয় ও টাইফয়েড নিয়ে নিয়মিত মুন্ডা শিশুরা আসে। কিশোরীদের মধ্যে অনিয়মিত মাসিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
শ্যামনগর উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার ৭৯৫টি পুকুর ও ১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ থাকলেও অধিকাংশই অকার্যকর। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও গভীর নলকূপ বসানোর উদ্যোগ নিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
৭৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৬ সালের মধ্যে দুই লাখ মানুষকে সুপেয় পানি দেওয়ার কথা থাকলেও মুন্ডা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অতসী মুন্ডা একসময় চুপ করে যায়। তারপর বলে, ‘খুব ইচ্ছা ছিল কলেজে পড়ব। পানির কষ্ট না থাকলে হয়তো পারতাম। যে টাকায় পানি কিনি, ওই টাকায় পড়াশোনা করতে পারতাম।’
অতসীর কাঁধে প্রতিদিনের পানির বোঝা শুধু তার নয়—এই বোঝা বহন করছে পুরো মুন্ডা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ।
