গহিন সুন্দরবনে যেভাবে ঈদ কাটবে বনকর্মীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ঈদ মানেই পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি, প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দ। কিন্তু সেই সুযোগ হয় না সবার। দেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত বন বিভাগের অনেক কর্মকর্তা ও বনরক্ষীকে ঈদের দিনও কাটাতে হয় গহিন বনের নির্জনতায়, পরিবার থেকে দূরে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঈদের সময় চোরা শিকারি চক্রের তৎপরতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে হরিণসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী শিকারের চেষ্টা চালায় তারা। তাই বন সুরক্ষায় সুন্দরবনের বিভিন্ন ফরেস্ট স্টেশন ও টহল ফাঁড়িতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সুন্দরবনের বিভিন্ন ফরেস্ট স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কয়েকজন বনরক্ষীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দায়িত্বের কারণে প্রায় প্রতি ঈদেই তাঁদের ছুটি মেলে না। পরিবার থেকে দূরে নির্জন বনে থেকেই পালন করতে হয় ঈদের দিন।

কয়রা উপজেলা সংলগ্ন সুন্দরবনের শাকবাড়িয়া নদী ধরে টহলে থাকা এক বনরক্ষী নজরুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবনের চাকরিতে প্রায়ই ঈদে বাড়ি যাওয়া হয় না। পরিবার ছাড়া ঈদ করতে কষ্ট লাগে, তবে দায়িত্বের কথা ভেবে মানিয়ে নিতে হয়।”

পশ্চিম সুন্দরবনের লাটাবেকি টহল ফাঁড়িতে কর্মরত বনরক্ষী আবদুল হাকিম প্রায় কয়েক মাস ধরেই গহিন বনে দায়িত্ব পালন করছেন। লোকালয় থেকে সেখানে পৌঁছাতে নৌকায় সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে। পাঁচজন সহকর্মীকে নিয়েই এবারও সেখানেই ঈদ উদযাপন করবেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমার বাড়ি বরিশালে। চাকরির পাঁচ বছরে মাত্র একবার পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পেরেছি। বাকি সব ঈদ সুন্দরবনেই কাটাতে হয়েছে। মন খারাপ হয়, তবে দায়িত্বই বড়।”

সুন্দরবনের কদমতলা ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, গত বছর ঈদের সময় তিনি পাতকোষ্টা টহল ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন। সেখানে মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। ঈদের দিন পাঁচজন সহকর্মী মিলে একটি মুরগি জবাই করে সেমাই রান্না করে নিজেদের মতো করে ঈদ উদযাপন করেছিলেন।

তিনি বলেন, “চাকরির জন্য অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। আমার ছোট মেয়েটা ফোন করে প্রায়ই জানতে চায়—‘আব্বু বাড়ি আসবা কবে?’ তখন কী বলব বুঝে উঠতে পারি না।”

সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, “পরিবার-পরিজন যখন ঈদের আনন্দে ব্যস্ত, তখন আমরা বনের নিরাপত্তায় টহলে থাকি। কয়েকজনকে ঈদের নামাজ পড়তে লোকালয়ে পাঠিয়ে দিয়ে আমরা টহল চালাই।”

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের পাতকোষ্টা, কাগাদোবেকি, গেওয়াখালী, আদাচাই, ভদ্রা, পুষ্পকাটি, কলাগাছিয়া, দোবেকি, লাটাবেকি, কাছিঘাটা, হলদেবুনিয়া, মান্দারবাড়িয়া, দুবলারচর ও হিরণ পয়েন্টসহ অনেক টহল ফাঁড়ি রয়েছে গভীর বনের ভেতরে। এসব স্থানে মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও নেই। সেখানে দায়িত্বে থাকা বনরক্ষীদের অনেক সময় ঈদের নামাজ পড়ার সুযোগও হয় না।

বাংলাদেশ বন বিভাগ–এর কর্মকর্তারা জানান, ঈদের কয়েক দিন আগে এসব টহল ফাঁড়িতে দায়িত্বে থাকা সদস্যরা লোকালয় থেকে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে যান। ঈদের দিন নিজেরাই রান্না করে সাদামাটাভাবে উৎসব পালন করেন।

সুন্দরবনের খুলনা অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, “ছুটির সময় দুর্বৃত্তরা বনের সম্পদ লুটপাট বা বন্য প্রাণী শিকারের সুযোগ নিতে পারে। এ কারণে ঈদের সময়ও সুন্দরবনের ভেতরের সব ফরেস্ট অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

পরিবার থেকে দূরে নির্জন বনে দায়িত্ব পালন করলেও দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পেরে গর্ববোধ করেন বনরক্ষীরা। তাঁদের কাছে সুন্দরবনের নিরাপত্তাই ঈদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।