উপকূলে ২ কোটি মানুষকে নিরাপদে রেখেছে সুন্দরবন

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা প্রতিনিধি। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ,পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা ও পটুয়াখালী উপকূলের ২কোটি মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ জলোচ্ছ্বাস থেকে নিরাপদে রেখেছে সুন্দরবন। এই সমস্ত উপকূলীয় জেলাগুলোর মানুষকে বছর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ জলোচ্ছ্বাস ‌‌থেকে বেঁচে থাকার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুন্দরবন। এই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র ও প্রাকৃতিক সম্পদ টিকিয়ে রাখতে আমাদের আন্তরিকতা হতে হবে। তা না হলে সুন্দরবন না থাকলে উপকূলের এই কোটি কোটি মানুষের বসবাস করা কোনমতেই সম্ভব হবে না।সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলকে রক্ষাকারী সুন্দরবন

সাতক্ষীরা, খুলনা আর বাগেরহাট জেলার উপকূলে বসবাসরত লাখ লাখ মানুষকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে মায়ের ভূমিকা পালন করে সুন্দরবন। আইলা, সিডর, বুলবুল, আম্পানসহ বিধ্বংসী সব ঘূর্ণিঝড় থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষা করতে সুন্দরবন তার সবুজ বেষ্টনী দিয়ে আগলে রেখে মায়ের ভূমিকা পালন করছে। গত দুই যুগে কমপক্ষে ১৫টি প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে উপকূলের মানুষকে রক্ষা করতে সুন্দরবন তার সবুজ বেষ্টনী হারিয়েছে। আইলা, সিডর পরবর্তী গভীর সুন্দবনে দেখা যায় সবুজ বেষ্টনীর ধ্বংসস্তূপ। সমুদ্র থেকে উঠে আসা এ সকল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আঘাত প্রথমেই বুক পেতে প্রতিহত করেছে সুন্দরবনের সবুজ বেষ্টনী। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক দূর্যোগের এই আঘাত প্রথমে বুক পেতে প্রতিহত করে সুন্দরবন। সুন্দরবন না থাকলে উকূলের এই জনপদগুলো অনেক আগেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো। আইলা, সিডরপরবর্তী ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবের পর সুন্দরবনে দেখা যায় সবুজ বেষ্টনীর ধ্বংসযজ্ঞ। এ যেন সন্তানদের বাঁচাতে প্রকৃতির সঙ্গে মায়ের জীবনমরণ লড়াই। মায়ের ভূমিকার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করে সুন্দরবন।

প্রকৃতির সৌন্দর্যপিপাসুদের আকর্ষণ সুন্দরবন। সবুজের সমারোহ সুন্দরবন। অসংখ্য নদ-নদী আর খালের মধ্যে চর ও নদীর মোহনার মধ্যে গড়ে উঠেছে সুন্দরবন। পৃথিবীর বিভিন্ন বনাঞ্চলেরর মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। ৯৭ সালের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি সুন্দরবনকে বিশ্বসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। পৃথিবীর ৫২২টি ঐতিহ্যের মধ্যে সুন্দরবনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনটি অভয়ারণ্য হিসেবে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭শ’ হেক্টর এলাকা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত হয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত সুন্দরবন। এর উত্তরে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, খুলনার কয়রা ও দাকোপ এবং বাগেরহাট জেলার মোংলা, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা থানা অবস্থিত। এর পূর্বে রয়েছে পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া ও বরগুনা জেলার পাথরঘাটা থানা। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে ভারতের দক্ষিণ -চব্বিশ পরগনার সুন্দরবন।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের মোট আয়তন ৫৭৭৩ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৭০ ভাগ বন এলাকা। প্রায় ৩০০ প্রজাতির গাছ ও লতাগুল্ম আর ৪০ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে সুন্দরবনে। দেড়শ’ বছর আগে সুন্দরবনের যে আয়তন ছিল, এখন তা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিশেজ্ঞদের মতে, বনের  ঘনত্ব  প্রতিবছর  ১.৭ ভাগ হারে কমছে। এর মূল কারণ, বিভিন্ন সময় নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস। এ ছাড়া অবাধে অবৈধভাবে গাছ কেটে সুন্দরবন উজাড় করা হচ্ছে। পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায়  গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বনের সুন্দরী গাছ ও গরান মরে যাচ্ছে।

সুন্দরবনে কোন ফলের গাছ নই। দু’-একটি থাকলেও তা মানুষ খেতে পারে না। সুন্দরবনের গাছগুলো উঁচু ও দীর্ঘ হয়। এদের বেশি ডালপালা, শাখা-প্রশাখা হয় না। শ্রেণীভেদে এখানে প্রথম শ্রেণীর গাছের উচ্চতা হয়ে থাকে ১৫ মিটার। ১০.৫ মিটার থেকে ১৫ মিটার উচ্চতার গাছগুলোকে ধরা হয় দ্বিতীয় শ্রেণীর এবং তৃতীয় শ্রেণীর গাছগুলোর উচ্চতা হয় ৬ থেকে ১০ মিটারের মধ্যে। এখানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর গাছের ঘনত্ব বেশি। বর্তমানে সুন্দরবনে ৩৩৪ প্রজাতির ছোটবড় বৃক্ষ, গুল্মলতা ও পরজীবী উদ্ভিদ পাওয়া যায়। একদিকে হিংস্র রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমির, বানর, হরিণসহ বিভিন্ন পশুপাখিদের বিচরণভূমি, অন্যদিকে বনের গভীর নীরবতা আর সবুজের সমারোহ খুব সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করে। আকর্ষণ করে বিশে^র সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের শ্বাসমূূলে ভরা  গেওয়া, গরান, বাইন, পশুর, গোলপাতা, হোগলাপাতা, বানর, হরিণ, কুমির, মদনটাকসহ হাজারো প্রাণবৈচিত্র্য।

সুন্দরবনের নদীগুলোর মধ্যে পশুর নদী সব থেকে বড়। আড়পাঙ্গাশিয়া, শিবসা, বলেশ্বর, মালঞ্চ, রায়মঙ্গল, যমুনা, কালিন্দী, হংসরাজ, ভদ্রা, চুনকুড়ি উল্লেখযোগ্য নদী জালের মতো সুন্দরবনজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এক লাখ ৭৫ হাজার ৬৮৫ হেক্টর এলাকা নিয়ে প্রায় সাড়ে চারশ’ ছোট-বড় নদ-নদী সুন্দরবনের প্রায় ৩০ ভাগ এলাকাজুড়ে রয়েছে।

অবস্থানগত দিক দিয়ে সাতক্ষীরা জেলার অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানায়। উচ্চতার দিকে এ অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ১৬ ফুট উঁচুতে। জেলার সীমানা যেভাবে নির্ধারিত হয়েছে, তাতে উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘ। বর্তমানে এ জেলার আয়তন ৩৮৫৮.৩৩ বর্গ কিলোমিটার। তবে এ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সব অংশে জনবসতি নেই। এর মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ বনাঞ্চল। সুন্দরবনের মধ্যে যে পরিমাণ ভূমি তার পরিমাণ ১৪৪৫.১৮ বর্গ কিলোমিটার।  ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক দিয়ে তাকালে এ জেলার পূর্বে খুলনা জেলা, পশ্চিমে চব্বিশ পরগণা জেলার (ভারত) বসিরহাট মহকুমা, উত্তরে যশোর জেলা ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের যে পাঁচটি জেলা নিয়ে সুন্দরবন তার মধ্যে সাতক্ষীরা দিয়েই কেবল সড়কপথে বাস থেকে নেমেই সুন্দরবন দেখা যায়। দেশের যে কোন এলাকা থেকে বাসযোগে শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জে নামলেই সামনে পড়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন।

সুন্দরবন দেশের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। সামুদ্রিক ঝড়, জলোচ্ছ্বাস থেকে এ অঞ্চলের মানুষকে রক্ষা করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে সে সব ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়, এর বেশিরভাগ আঘাত হানে নোয়াখালী, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম এলাকায়। দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানলেও সুন্দরবনের কারণেই দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকায় প্রানহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কম হয়। সুন্দরবনের বিশালত্ব ও  সবুজ বেষ্টনীর কারণে উপকূলবাসী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি থেকে বেঁচে যায়। নিজের সবুজ বেষ্টনী দিয়ে আগলে রেখে যেন মায়ের ভূমিকা পালন করে সুন্দরবন।