উপকূলের নারীদের লোনাপানির জীবন, রক্ষা করবে কে?

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারীদের জীবনে। লবণাক্ত পানির আগ্রাসনে এখানে খাবার পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে কৃষি ও জীবিকা হারিয়ে মানুষ পড়ছে চরম অনিশ্চয়তায়। এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন উপকূলের নারীরা।

শ্যামনগর উপজেলার বৈশখালী গ্রামের সালেহা খাতুনের বাড়ির চারপাশে পানি থাকলেও সুপেয় পানির সংকট লেগেই আছে। ৩০ লিটার পানি কিনতে হয় ২০ টাকায়। স্বামীহারা সালেহা বলেন, “পানি, খাবার—সবকিছুই কিনে খেতে হয়। বছরে দুই–তিনবার ঘর ভাঙে। এভাবে কত দিন বাঁচা যায়?”

ঘূর্ণিঝড় আইলা ও পরবর্তী দুর্যোগে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পুকুর, কৃষিজমি ও বসতভিটা নষ্ট করেছে। ওয়াটারএইডের এক গবেষণা অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে উপকূলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। এর ফলে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিনির্ভর জীবিকা, বাড়ছে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন।

সুপেয় পানির অভাবে নারীদের প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতা ও শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন তাঁরা। লবণাক্ত পানিতে গোসল ও কাপড় ধোয়ার কারণে নারীদের মধ্যে বাড়ছে চর্মরোগ, লিউকোরিয়া ও জরায়ু সংক্রান্ত জটিলতা। অনেক নারী অল্প বয়সেই জরায়ু অপসারণে বাধ্য হচ্ছেন।

শ্যামনগরের বৈশখালী গ্রামের ফিরোজা বেগম বলেন, “সব সময় লোনা পানিতেই কাজ করতে হয়। মাসের পর মাস রক্তপাত আর ব্যথা সহ্য করেছি। শেষে জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছে।”

স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকার ফলে নারীদের যোনিপথে সংক্রমণ বাড়ে, যা পরবর্তীতে ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

পানিসংকট ও দারিদ্র্যের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কিশোরীদের জীবনেও। উপকূলীয় এলাকায় বাল্যবিয়ের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। স্থানীয় শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শুধু শ্যামনগর উপজেলাতেই শত শত শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। পরিবারগুলো মনে করছে, মেয়েদের বিয়ে দিয়ে ‘ঝুঁকি’ কমানো যায়।

ইউনিসেফ বাংলাদেশ জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতা পরিবারগুলোকে বাল্যবিয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ এতে মেয়েদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সরকার বলছে, উপকূলীয় লবণাক্ততা মোকাবিলায় সুপেয় পানি প্রকল্প, লবণ সহনশীল ফসল এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণে কাজ চলছে। তবে স্থানীয়দের মতে, এসব উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিকে পণ্য নয়, মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা, নদী–খাল দখলমুক্তকরণ এবং নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।

উপকূলের নারীরা শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার নন, তাঁরা কাঠামোগত বৈষম্যেরও ভুক্তভোগী। প্রশ্ন থেকেই যায়—লোনাপানির এই জীবনে তাঁদের রক্ষা করবে কে?