
এপ্রিল–মে মানেই জীবিকার মৌসুম, উৎপাদন বাড়লেও বাড়ছে উদ্বেগ
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আবারও শুরু হয়েছে মধু সংগ্রহের মৌসুম। এপ্রিল–মে—দুই মাসকে ঘিরে রওনা হন উপকূলীয় অঞ্চলের চার হাজারেরও বেশি পেশাদার মৌয়াল। ঝড়–জোয়ার, বাঘ–কুমিরের ভয়কে সঙ্গী করেই তারা খুঁজে ফেরেন বনভিত্তিক খাঁটি মধু। জীবিকার টানাপোড়েনে থাকা এই মানুষগুলোর কাছে এ সময়টুকু যেন স্বপ্নপূরণের মৌসুম।
গরান, খলিষা, কেওড়া ও বাইন—সুন্দরবনের এসব ফুলেই মৌমাছি তৈরি করে খাঁটি মধু। এর মধ্যে খলিষা ফুলের মধু সাদা রঙের ও সর্বোচ্চ মানের বলে পরিচিত। দেশে এর কদর যেমন বেশি, আন্তর্জাতিক বাজারেও চাহিদা বাড়ছে।
পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, ‘মৌয়ালদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মাঠে পাঠানো হয়। কারণ উপযুক্ত সময়ের আগে চাক কাটলে মধুর উৎপাদন কমে যায় এবং মৌমাছিরও ক্ষতি হয়।’
২০২০ সালে সাতক্ষীরা রেঞ্জে মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৫০ কুইন্টাল। আহরিত হয় ২ হাজার ৬ কুইন্টাল। মোমের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা ২৬৫ কুইন্টাল থাকলেও সংগ্রহ হয় ৬০২ কুইন্টাল। ওই বছর রাজস্ব আসে ১৫ লাখ টাকার বেশি।
২০২৪ সালেও উৎপাদন ছিল উল্লেখযোগ্য—মাত্র ৩৬৪টি পাশের মাধ্যমে সংগ্রহ হয় ১,২৩৫ দশমিক ৫০ কুইন্টাল মধু ও ৩৭০ দশমিক ৬৫ কুইন্টাল মোম। সরকার পায় প্রায় ২৮ লাখ টাকা রাজস্ব। ২০২৫ সালে লক্ষ্য আরও বাড়ানো হয়েছে—মধু ১,৫০০ কুইন্টাল, মোম ৪০০ কুইন্টাল।
বন কর্মকর্তা হাসানুর রহমান জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফুল ফোটার হার কমে যাচ্ছে, এতে সরাসরি কমছে মধু উৎপাদন। তবে বন পরিচর্যা ও নতুন গাছ লাগানোর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বৃদ্ধিও দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, মৌসুম শুরুর আগেই কিছু অসাধু জেলে–বাওয়ালি অপরিপক্ক চাক কেটে ফেলছেন। এতে নষ্ট হচ্ছে মধুর মান, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক প্রজননচক্র। পাশাপাশি কিছু ব্যবসায়ী চিনি জ্বালিয়ে কৃত্রিম মধু তৈরি করে ‘সুন্দরবনের খাঁটি মধু’ নামেই বিক্রি করছেন—যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সুন্দরবনের মধু ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পায়। এর আগে ২০২৪ সালে ভারত একই দাবি তুললে বাংলাদেশে গবেষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেলেও এখন মান নিয়ন্ত্রণের চাপ আরও বেড়েছে।
শ্যামনগরের এনজিও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির পরিচালক মাসুদুর রহমান মুকুল বলেন, ‘সুন্দরবনের মধু বিশ্বমানের। যদি সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা যায়, দাম আরও কয়েকগুণ বেশি পাওয়া যাবে।’ তিনি নিউজিল্যান্ডের ভানুকা মধুর উদাহরণ দেন—যার কেজিতে দাম ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
মুকুল মনে করেন, উপকূলীয় অঞ্চলে সরকারিভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপিত হলে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও সম্ভব হবে।
সুন্দরবনের মধু শুধু একটি পণ্য নয়—এটি উপকূলের মানুষের জীবিকা, দেশের ঐতিহ্য এবং সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত। খাঁটি মধুর গন্ধে যেমন বেঁচে থাকে বন, তেমনি মৌয়ালের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ, বন সংরক্ষণ এবং অসাধু কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।
