
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : একসময় যাকে বলা হতো ‘সাদা সোনা’, সেই চিংড়ি আজ দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের বহু মানুষের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং উদ্বেগের নাম। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিপর্যস্ত উপকূল যখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ব্যাপকহারে চিংড়ি চাষ সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
লবণাক্ততার ভেতর দিয়ে শুরু
১৯৮০–এর দশক। উপকূলে লবণাক্ততা বাড়ছে, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ধানক্ষেত প্লাবিত হচ্ছে। কৃষকেরা ভাবলেন—যেহেতু লোনা পানি ঠেকানো যাচ্ছে না, তাহলে সেটাকেই কাজে লাগানো যাক। ধানক্ষেত ডুবিয়ে শুরু হলো বাগদা চিংড়ি চাষ। সরকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোও একে জলবায়ু–সহনশীল সমাধান হিসেবে উৎসাহ দেয়।
ফলে খুলনা–সাতক্ষীরা–বাগেরহাট জেলায় প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার একর জমি ধীরে ধীরে চিংড়ির ঘেরে রূপান্তরিত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে সাফল্য পেয়ে ‘সাদা সোনা’ খ্যাতি পায় এই শিল্প।
গাবুরার গল্প: স্বপ্ন থেকে শঙ্কা
সাতক্ষীরার গাবুরা দ্বীপের বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম এখন কাঁকড়া চাষে মন দিয়েছেন। তাঁর বাবা ছিলেন চিংড়ি চাষি। কিন্তু ঘনঘন ভাইরাস সংক্রমণ, লোকসান ও ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কায় সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
২০২০ সালে Cyclone Amphan আঘাত হানার পর গাবুরার বিস্তীর্ণ এলাকা ১৮ মাস লোনা পানিতে ডুবে ছিল। স্থানীয়দের ভাষায়, “ঘেরের লোনা পানি আর সাইক্লোন—দুটো মিলে জমিকে বিষ বানিয়ে দিয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে লবণাক্ততা জমির উর্বরতা কমিয়ে দেয়, মিঠাপানির উৎস দূষিত করে এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে।
ভাইরাস ও অতিরিক্ত মজুদের ফাঁদ
চিংড়ি ঘেরে হোয়াইট স্পট ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রায় নিয়মিত ঘটনা। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চাষিরা একই ঘেরে বেশি রেণু ছাড়েন। এতে রোগ আরও দ্রুত ছড়ায়।
আসাদুল বলেন, “আগে ৫০০ চিংড়ি ছাড়তাম, এখন ৩,০০০ পর্যন্ত ছাড়তে হয়েছে। তবু টিকে থাকা কঠিন।”
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত মজুদ ও রাসায়নিক ব্যবহারে ঘেরগুলো রোগের প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।
সামাজিক টানাপোড়েন ও ‘চিংড়ি মাফিয়া’
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ঘেরের লোনা পানি চুইয়ে পাশের জমি নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাঁধ কেটে জোর করে লোনা পানি ঢোকানোর অভিযোগও রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে উপকূল রক্ষা বাঁধ কাটায় প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে আসে।
স্থানীয়দের ভাষায়, এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীই ‘চিংড়ি মাফিয়া’। ফলে ধানচাষি ও চিংড়ি চাষির মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। একসময় যে জমি খাদ্য জোগাত, এখন তা রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে ব্যস্ত—এ অভিযোগও শোনা যায়।
রপ্তানির উত্থান, দামের পতন
২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩০ হাজার টন চিংড়ি রপ্তানি করে, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার অজুহাতে বাগদা চিংড়ির দাম হঠাৎ কমে গেছে।
বাংলাদেশ হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতি (বিএফএফইএ) দাবি করেছে, বৈশ্বিক বাজারে দরপতনের কারণেই এ অবস্থা। তবে চাষিদের প্রশ্ন—রপ্তানি বন্ধ থাকলে বাকিতে কেন চিংড়ি কেনা হচ্ছে?
বাগেরহাটের বারাকপুর আড়তে দেখা গেছে—
১৫ গ্রেড বাগদা: আগে ১৩০০–১৪০০ টাকা, এখন ৭৫০–৮০০ টাকা
২০ গ্রেড: আগে ১২০০ টাকা, এখন ৭০০ টাকা
৩০ গ্রেড: আগে ৯০০ টাকা, এখন ৬০০ টাকা
ডিপো মালিকরা বলছেন, তাঁরা নিজেরাও বাকিতে বিক্রি করছেন। ফলে কোটি কোটি টাকা আটকে আছে চাষিদের।
দারিদ্র্য কমল কতটা?
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের গবেষক Kasia Paprocki তাঁর বই Threatening Dystopia–তে লিখেছেন, চিংড়ি চাষকে একসময় জলবায়ু অভিযোজনের একমাত্র সমাধান হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এটি সামাজিক বৈষম্য ও পরিবেশগত ক্ষতি বাড়িয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই শিল্পের সিংহভাগ লাভ পেয়েছে প্রভাবশালী জমির মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা; প্রান্তিক চাষিরা রয়ে গেছেন ঝুঁকির মুখে।
ব্যতিক্রমী মডেল: মিঠাপানির গলদা
অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলে পার্বতীপুর–এর সরকারি মৎস্য খামারে গলদা চিংড়ির পরীক্ষামূলক উৎপাদন সফল হয়েছে। এখানে মিঠাপানিতে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পিএল উৎপাদন করে চাষিদের সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলের লোনা নির্ভর বাগদার বদলে মিঠাপানির গলদা ও বহুমুখী মাছচাষ হতে পারে তুলনামূলক টেকসই বিকল্প।
সামনে কোন পথ?
পরিবেশবিদদের মতে, চিংড়ি চাষ পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয়; তবে নিয়ন্ত্রণ, অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা ও খাদ্য–নিরাপত্তা বিবেচনায় ভারসাম্য দরকার।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বাঁধ ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি
লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করা
টেকসই ও বহুমুখী কৃষি–অ্যাকুয়াকালচার
সরাসরি চাষির হাতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা
উপকূলের মানুষ বলছেন, “আমরা টিকে থাকতে চাই। কিন্তু ভুল সমাধান দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখা যাবে না।”
একসময় যে চিংড়ি ছিল সাদা সোনা, এখন তা অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে ঋণের বোঝা। প্রশ্ন হলো—উপকূলের ভবিষ্যৎ কি রপ্তানিমুখী একক শিল্পে, নাকি প্রকৃতি–সমন্বিত বহুমুখী জীবিকায়?
