শ্যামনগরে নারীর কাঁধে সংসার, স্বামী উধাও

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা প্রতিনিধি। সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলায় উপকূলে নারীদের কাঁধে সংসার স্বামী উধাও। উপকূলের অধিকাংশ মানুষ গরীব দুস্ত মেয়েরা একটু বেড়ে উঠলেই বিয়ে দেয় পরিবার। অনেক পরিবারে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহ হয় আবার অনেক পরিবারে কেউ না জানার ভানেই মেয়ে বিয়ে দিয়ে বসে আবার অনেক পরিবারে ছেলের ঠিকানা না জেনেই মেয়ে বিয়ে দেয়। সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত অনেক মেয়ের দুটি ও একটি বাচ্চা নিয়ে বিধবা হতে হয় বা স্বামী পরিত্যক্ত হতে হয়। স্বর্ণ ‌ছাড়া সামিরা অনেকে স্ত্রীদের তালাক দিয়ে চলে যায় আবার বেশিরভাগ নারীরা স্বামী নেই তবুও ঝুলে আছে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়নি তবে স্বামীর কোন খোঁজ নেই। এভাবেই উপকূলের নারীদের কাঁধে সংসারের ভার চেপেছে এমন সংখ্যা শ্যামনগর উপজেলায় উপযোগী অঞ্চলে কয়েক হাজার রয়েছে। তাদের জীবন চলে দৈনন্দিন নদীতে রেনু পোনা ধরে অথবা অন্যের বাড়ি কাজ করে। যাদের কাঁধে বাচ্চা আছে শিখাতে পারেনা লেখাপড়া সেই অবুঝ শিশুরাও আয় রোজগারের জন্য হাতে জাল নিয়ে ছুটছে নদীর পাড়ে অথবা কোন কোন শিশুরা আয়ের সন্ধানে চলে যায় প্রতিবছর ইটভাটায়।দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে এই উপকূলীয় এলাকার নারীরা স্বামীর অনুপস্থিতিতে ওঠেন পরিবারের প্রধান। শ্যামনগরের উপকূলবর্তী মুন্সীগঞ্জ, গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালী ও রমজাননগরসহ অন্যান্য ইউনিয়নের অধিকাংশ নারী জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনসংলগ্ন নদীগুলোতে রেণু পোনা ও কাঁকড়া আহরণ করেন।

উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ নারীকে এভাবে সংগ্রাম করে সংসার চালাতে হয়। তবু কোথাও তারা পান না এতটুকু স্বীকৃতি। নির্যাতন, অবহেলা আর বৈষম্য যেন এদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এ ছাড়া আছে যৌতুকের চাপ, তালাকের ভয়। স্বামীর একাধিক বিয়ে শেষ জীবনে উপকূলীয় নারীদের রাখে চরম অস্বস্তিতে।

তাদেরই একজন সোনামনি দাসী (৬০)। তিনি শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ বাজারের পাশের জেলেপাড়ায় থাকেন। তার একাকী জীবন। ছোটবেলায় সোনামনির বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় সুন্দরবনে মাছ শিকারে গিয়ে বাঘের আক্রমণে তার স্বামী মারা যান।

এরপর এক মাস বয়সী শিশুসহ সোনামনিকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন শাশুড়ি। বাঘ তার স্বামীকে নিয়েছে গেছে এ কারণে সমাজ সোনামনিকে ‘অপয়া’ আখ্যা দেন। কিছুদিন পর দেবরের সঙ্গে সোনামনির বিয়ে হয়। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয় স্বামীও বাঘের আক্রমণে মারা যান। দুই স্বামী বাঘের পেটে যাওয়ার পর সোনামনি সমাজে ‘স্বামীখেকো’ বলে পরিচিতি পান। সমাজ তাকে দেখে ভিন্ন চোখে। কোনো অনুষ্ঠানে তাকে দাওয়াত দেওয়া হতো না। সমাজে চলাফেরাই তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। শাশুড়ি তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, যাতে সকালে ঘুম থেকে উঠে সোনামনির মুখ দেখতে না হয়।

সোনামনির প্রথম স্বামীর একটি সন্তান ও দ্বিতীয় স্বামীর তিনটি সন্তান। অর্থাৎ তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলেমেয়েরা সবাই বিবাহিত। থাকেন আলাদা আলাদা। মাকে তারা তাদের সঙ্গে রাখেননি। এমনকি তারা মায়ের খোঁজখবরও নেন না।

বর্তমানে সংসার কীভাবে চলে জানতে চাইলে সোনামনি দাসী বলেন, ‘আমার আর সংসার! আমি একলা! বাজারের দোকান ঝাড়ু দিই, গাঙে জাল টানি মাছ, কাঁকড়া ধরি। ঘেরে মাটি কাটার কাজ করি। যখন যে কাজ পাই তা-ই করি। এভাবে চলতিছে।’

তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি বিধবা’ তা তোমরা জানো, কিন্তু আমাগে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা জানেন না।

চন্দ্রিকা বন্দ্যোপাধ্যায় (৫৫)। শ্যামনগর পৌরসভার হায়বাতপুর গ্রামের মৃত অনিমেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে। তার বাবা ছিলেন দক্ষিণ খুলনার বিশিষ্ট সেতার বাদক ও সংগীতশিল্পী। তার তিন মেয়ের মধ্যে চন্দ্রিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সবার বড়।

চন্দ্রিকা উপকূলীয় এলাকার সুবিধাবঞ্চিত নারীদের একত্রিত করে তৈরি করেন নারী সংগঠন ‘নকশিকাঁথা’।

সংগঠনটি মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরে নিবন্ধিত। চন্দ্রিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সংগঠনটির পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এ সংগঠনের মাধ্যমে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যক্রম, কৃষি, হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ, সুপেয় পানির নিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এসব কার্যক্রমের কারণে তিনি জয়িতা ও সফল সংগঠক পুরস্কারসহ অন্যান্য সম্মাননা লাভ করেন।

তিনি উপজেলা সরকারি কৃষি কমিটি, ভূমি কমিটি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিটি, বেসরকারি পানি কমিটি, জলবায়ু পরিষদ সদস্য, মহিলা ক্রীড়া সংস্থাসহ বিভিন্ন কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। গত কয়েক বছর আগে তিনি দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের সহায়তায় ইউরোপ, সুইডেন, ডেনমার্কসহ কয়েকটি দেশে ভ্রমণ করে বাংলাদেশের নারীদের সাফল্য নিয়ে বিভিন্ন সেমিনারে বক্তব্য দেন।

চন্দ্রিকা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ১৯৯৪ সালে তিনি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহায়তায় তার সংগঠন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, পুকুরে ফিল্টার স্থাপন, ঝরে পড়া শিশুদের উপ-আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান, নারীদের লবণসহিষ্ণু ধানবীজ বিতরণ, পুষ্টির চাহিদা পূরণে নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে ক্লাব গঠন ও প্রশিক্ষণ, প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, হস্তশিল্প ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে।

শেফালী বিবি (৫৫) সুন্দরবনঘেঁষা দাতিনাখালী গ্রামের ছবেদ আলী গাজীর স্ত্রী। কেওড়া ফলের টক-ঝাল-মিষ্টি আচার আর জেলি তৈরি করে তিনি তার ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন।

শেফালী জানান, সুন্দরবনের কোলে চুনা নদীর পাড়ে খাস জমিতে তার বসতি। তার স্বামী সুন্দরবন থেকে মোম, মধু, মাছ, কাঁকড়া ও গোলপাতা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু তাতে ছয়জনের সংসার ঠিকমতো চলত না। তাই নিজেই কিছু করার কথা ভাবতে থাকেন। একপর্যায়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের পরামর্শে তিনি সুন্দরবনের কেওড়া ফল দিয়ে টক, ঝাল ও মিষ্টি আচার, জেলি এবং চকলেট তৈরি শুরু করেন। একই সঙ্গে মোম দিয়ে শোপিস, মোমবাতিসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বিক্রি করতে থাকেন। এতে তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। অর্থনৈতিকভাবে সাফল্যের মুখ দেখেন তিনি।

শেফালী শুধু নিজের ভাগ্যের চাকাই ঘোরাননি, তিনি বননির্ভর নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘দাতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠন’। শতাধিক নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে করেছেন আত্মনির্ভরশীল। প্রশিক্ষিত এসব নারীও কেওড়া ফলের চকলেট, আচার ও জেলি এবং সুন্দরবনের মধু বয়ামজাত করে বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন। আর এসব পণ্য বিক্রির লভ্যাংশ ব্যয় হচ্ছে ‘বাঘ বিধবা’ ও বনজীবী নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে।

এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান মিসেস শাহানা হামিদ বলেন, উপকূলের নারীরা যেভাবে সংসারের হাল ধরছেন সেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে সরকারি সহায়তার মাধ্যমে নারীদের এসব কাজে আরও উদ্যোগী করা প্রয়োজন। কারণ এরাই অর্থনীতি চাঙা করার মূল হাতিয়ার। উপকূলে নারী জেলে রয়েছেন। আর এ তথ্য সরকারের কাছে নেই। তাদের নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।

তিনি আরও বলেন, উপকূলের নারীরা যেসব কাজে এগিয়ে রয়েছে, তা দেখতে হলে এখানে আসতে হবে। দেশের সামগ্রিক নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসব নারীও অংশীদার। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এসব নারীকে বিনা সুদে ঋণ সহায়তা দেওয়া উচিত।