
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি | সাতক্ষীরা : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে পদ্মা সেতু। ২০২২ সালের ২৫ জুন সেতুটি চালু হওয়ার পর বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় বড় রূপান্তর ঘটেছে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে। যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন বেড়েছে, তেমনি কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আদায়েও এসেছে দৃশ্যমান অগ্রগতি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোমরা এখন দক্ষিণাঞ্চলের এক উদীয়মান অর্থনৈতিক জোন।
রাজস্ব ও বাণিজ্যে ঊর্ধ্বগতি
বন্দর সূত্র জানায়, দেশের তৃতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর হিসেবে ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করে ভোমরা। ভারতের কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের সঙ্গে দূরত্ব তুলনামূলক কম হওয়ায় আমদানি-রপ্তানিতে এ বন্দরটি ব্যবসায়ীদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। বর্তমানে প্রতিদিন ভারত থেকে প্রায় ৪০০ পণ্যবাহী ট্রাক ভোমরা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায় ৫০ থেকে ১০০ ট্রাক।
প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হচ্ছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বছর শেষে এ অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকায়। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এখানে।
পদ্মা সেতু: বদলে গেছে যাতায়াতের চিত্র
পদ্মা সেতু চালুর আগে ভোমরা থেকে ঢাকায় পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি। ফেরিঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষা, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও অনিশ্চয়তায় পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হতো। এখন একই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। ফলে পরিবহন ব্যয় কমেছে, পণ্যের গুণগত মান বজায় থাকছে এবং বাজারে সময়মতো সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে।
ভোমরার পরিবহনশ্রমিকরা জানান, আগে ফেরিতে উঠতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। ঝড়, কুয়াশা বা স্রোতের কারণে অনেক সময় আটকে থাকতে হতো নদীর পাড়েই। এখন সেতু চালুর ফলে সেই দুর্ভোগের অবসান হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘নিরাপদ ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম বলেন, পদ্মা সেতুর সুফলে আমদানি করা পণ্য দ্রুত রাজধানীতে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ—দুই-ই কমেছে। ব্যবসায়ীরা এখন আগের চেয়ে বেশি স্বস্তিতে কাজ করতে পারছেন।
ভোমরা স্থলবন্দরের সাবেক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম খান জানান, বন্দরে কাস্টমস হাউস চালু হওয়ায় সব ধরনের পণ্য আমদানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
বন্দরের প্রাক্তন উপপরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, ১৫ একর জমির ওপর বন্দরের কার্যক্রম চলছে এবং কাস্টমস হাউসের জন্য আরও ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ভোমরা দেশের অন্যতম শীর্ষ স্থলবন্দরে পরিণত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক আফরোজা আক্তার বলেন, ভোমরা স্থলবন্দর সাতক্ষীরাবাসীর জন্য গর্বের প্রতীক। কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি সীমান্তবর্তী যোগাযোগ ব্যবস্থাও সহজ হয়েছে।
সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল বলেন, ভোমরা স্থলবন্দরকে আরও গতিশীল ও নিরাপদ করতে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ভবিষ্যতে এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তিনি আশাবাদী।
আঞ্চলিক গৌরবের প্রতীক
প্রায় ২২ লাখ মানুষের জেলা সাতক্ষীরার অর্থনীতিতে ভোমরা স্থলবন্দর এখন প্রাণকেন্দ্র। পদ্মা সেতুর সুফলকে পুঁজি করে বন্দরকেন্দ্রিক শিল্প, পরিবহন ও সেবাখাত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে ভোমরা স্থলবন্দর শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও আরও বড় ভূমিকা রাখবে।
