লবণাক্ত জমিতে খেজুর চাষ: সাতক্ষীরায় ভাঙন রোধে নতুন সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : উপকূলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস যেন নিত্যসঙ্গী। বাঁধ ভাঙে, লোনা পানি ঢুকে পড়ে মাঠে, নষ্ট হয় ফসল ও বসতভিটা। এমন বাস্তবতায় সাতক্ষীরা-এর শ্যামনগর উপজেলা এলাকায় খেজুরগাছকে ঘিরে ভাঙন রোধের এক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ নজর কাড়ছে।

উপজেলার হওয়ালভাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা জি এম সিরাজুল ইসলাম নিজের উদ্যোগে লবণাক্ত জমিতে গড়ে তুলেছেন খেজুরবাগান। শ্যামনগর-নওয়াবেঁকি সড়কের পাশে আট বিঘা জমিতে মাছ চাষের পাশাপাশি তিনি সৌদি জাতের আজওয়া, মরিয়ম ও মেডজুল খেজুর চাষ করছেন।

বাগানে সারিবদ্ধ খেজুরগাছ, কোথাও কোথাও ঝুলছে ফলের থোকা। তবে এই চাষের মূল গুরুত্ব শুধু ফলন নয়। কৃষিবিদদের মতে, খেজুরগাছের গভীর ও বিস্তৃত শিকড় উপকূলীয় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে, যা ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় ভাঙন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

চার বছর আগে লবণাক্ত জমিতে এই চাষ শুরু করেন সিরাজুল ইসলাম। প্রথমদিকে অনেকেই এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলেও এখন গাছগুলো বড় হয়ে ফলন দিতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, “একই জমিতে মাছ চাষ ও খেজুর চাষ করে বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করেছি। ভবিষ্যতে ভালো ফলনের আশা করছি।”

বাগানের ভেতরে ছোট ছোট ঘের তৈরি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে ও লবণাক্ততা কমাতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে এসব ঘেরে মাছ চাষ করে বাড়তি আয়ও হচ্ছে।

এদিকে কালীগঞ্জ উপজেলা-এর নরহরকাটি গ্রামের শোকর আলীও খেজুর চাষে সফলতার গল্প লিখছেন। একসময় বাহরাইন-এর খেজুর বাগানে কাজ করা এই কৃষক দেশে ফিরে গড়ে তুলেছেন খেজুরের নার্সারি। বর্তমানে তার নার্সারিতে ১০ থেকে ১২ হাজার চারা রয়েছে, যার কিছুতে ইতোমধ্যে ফল ধরেছে।

শোকর আলী বলেন, “খেজুর এমন একটি ফসল, যা কম পরিচর্যায় ভালো ফলন দেয়। উপকূলীয় এলাকায় এটি লাভজনক হতে পারে।” তিনি প্রতি চারা ২০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় কৃষকরাও ধীরে ধীরে খেজুর চাষে ঝুঁকছেন। বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, “লবণাক্ততার কারণে আগের মতো ফসল হয় না। এখন অনেকে ঘেরের পাড়ে খেজুর লাগাচ্ছেন। এতে আয় বাড়বে, মাটিও রক্ষা পাবে।”

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, খেজুরগাছ লবণাক্ততা ও খরার প্রতি সহনশীল। এর শিকড় মাটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে, আর গাছের সারি বাতাসের গতি কমিয়ে মাটির ক্ষয় রোধ করে। ছায়া ও ঝরা পাতা মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

সাতক্ষীরা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় শুধু কংক্রিট বাঁধই সমাধান নয়। পরিকল্পিতভাবে খেজুরগাছ রোপণ করলে এটি প্রাকৃতিক বাঁধ হিসেবে কাজ করতে পারে।”

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে খেজুরগাছভিত্তিক এই উদ্যোগ একদিকে যেমন মাটির ভাঙন রোধে সহায়ক হতে পারে, অন্যদিকে কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের পথও তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গবেষণা ও সরকারি সহায়তা পেলে উপকূলীয় অঞ্চলে খেজুর চাষ বড় পরিসরে সম্প্রসারণ সম্ভব। এতে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং দেশের কৃষিতে যুক্ত হবে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।