
নাজমুল হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদক : পৌষের হিমশীতল সকাল নামলেই লক্ষ্মীপুরের গ্রামাঞ্চলে চোখে পড়ে চিরচেনা এক দৃশ্য। যতদূর চোখ যায়, বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকে ধানগাছের অবশিষ্টাংশ—স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় নাড়া। পৌষ ধান কাটার পর মাঠে পড়ে থাকা এই নাড়া যেন নীরবে জানিয়ে দেয়, আরেকটি কৃষিবর্ষের একটি অধ্যায় শেষ হয়েছে।
একসময় এই নাড়াই ছিল গ্রামীণ জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ধানগাছের খের দিয়েই তৈরি হতো খড়ের ঘর। বর্ষা, গ্রীষ্ম আর শীত—সব ঋতুতেই এসব ঘরেই কাটত মানুষের জীবন। সময়ের পরিবর্তনে খড়ের ঘর আজ বিলুপ্তপ্রায়। গ্রামেও উঠে গেছে ইট–সিমেন্টের দালান। তবে নাড়া এখনো টিকে আছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিজীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে।
ধান, সয়াবিন, নারিকেল ও সুপারির জন্য পরিচিত লক্ষ্মীপুর জেলা। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার অধিকাংশ কৃষিজমিতে এখনো ধানই প্রধান ফসল। চলতি মৌসুমে পৌষ ধান ঘরে তোলার পর কৃষকেরা কিছুদিন জমিতে নাড়া রেখে দেন। এরপর জমি চাষ দিয়ে প্রস্তুত করা হয় পরবর্তী ফসলের জন্য। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে এসব জমিতে সয়াবিন, বাদাম, ডাল এবং কিছু এলাকায় ইরি ধানের আবাদ হয়। এই ধারাবাহিক চাষাবাদই লক্ষ্মীপুরের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছে।
নাড়া শুধু ধান কাটার পর পড়ে থাকা অবশিষ্টাংশ নয়। গবাদিপশু নির্ভর এই অঞ্চলে নাড়া থেকে তৈরি খড় গরু ও ছাগলের প্রধান খাদ্য। অনেক খামারি নাড়া সংগ্রহ করে খড়ের পালা বানিয়ে সারা বছরের জন্য সংরক্ষণ করেন। খড়ের বাজারদর বাড়লে এই নাড়া কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবেও ভূমিকা রাখে।
পৌষের শীত আর নাড়া ঘিরে জড়িয়ে আছে লক্ষ্মীপুরের গ্রামীণ জনপদের বহু স্মৃতি। একসময় শীতের সকাল ও সন্ধ্যায় নাড়া কেটে জড়ো করে আগুন পোহানো ছিল গ্রামবাংলার চিরচেনা চিত্র। সেই আগুন ঘিরেই বসত গল্পের আসর। আলোচনায় আসত হাটের খবর, ফসলের হিসাব আর গ্রামের সুখ–দুঃখ।
প্রবাস ফেরত মো. রাকিব মিয়া বলেন, শৈশবে সকাল–সন্ধ্যা নাড়া কেটে আগুন পোহানো ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এখন শহরের যান্ত্রিক জীবনে সেই উষ্ণতা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মাঠে দাঁড়িয়ে নাড়া দেখলেই চোখে ভেসে ওঠে শৈশবের দিনগুলো।
কমলনগরের চর কাদিরা গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান, পাঁচ–ছয় বছর আগেও ধান কাটার পর ইঁদুরের গর্ত থেকে পড়ে থাকা ধান কুড়িয়ে বিক্রি করত গ্রামের শিশুরা। তখন বেপারিরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধানের ওজনে জিলাপি দিত। সঙ্গে থাকত রসপোয়া আর গুলগুলা। এই ছোট ছোট আনন্দই ছিল গ্রামীণ শৈশবের বড় পাওয়া।
স্থানীয় কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, চলতি মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো স্বচ্ছলতা নেই। একসময় গোলাভরা ধান থাকত। নিজেদের খাওয়ার পরও বিক্রি করা যেত। এখন অনেক সময় পরিবারের খাবার নিশ্চিত করতেই হিমশিম খেতে হয়।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষিপদ্ধতির আধুনিকায়নের ফলে খড়ের ঘর হারিয়ে গেলেও নাড়া এখনো গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এটি একদিকে কৃষকের উৎপাদনের অংশ, অন্যদিকে পশুপালনের অবলম্বন। একই সঙ্গে বহন করে গ্রামীণ স্মৃতি ও জীবনের ইতিহাস।
পৌষের শেষে জমি আবার চাষ হবে। নাড়া মিশে যাবে মাটির সঙ্গে। মাঠে উঠবে নতুন ফসল। তবু লক্ষ্মীপুরের মাঠে পড়ে থাকা এই নাড়া মনে করিয়ে দেবে কৃষি আর স্মৃতির এক সহাবস্থানের গল্প—যা সময়ের সঙ্গে বদলালেও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
