দিন দিন কমছে সামুদ্রিক হাঙ্গর, অবৈধ বাণিজ্যে হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : দিন যতই যাচ্ছে, ততই কমে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনসংলগ্ন নদ–নদীর হাঙ্গর মাছ। জেলেদের জালে অনিচ্ছাকৃতভাবে ধরা পড়লেও উচ্চমূল্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে এসব হাঙ্গর আবার নদী বা সমুদ্রে ছাড়া হচ্ছে না। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এসব হাঙ্গর কিনে নিয়ে পাচার করছে বিদেশে। ফলে দেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।

বাংলাদেশে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে হাঙ্গর কখনোই লক্ষ্যপ্রজাতি (টার্গেট স্পিসিজ) নয়। অন্যান্য মাছ ধরার সময় গিলনেট, ট্রামেল নেট, সেটব্যাগ নেট ও টানা বড়শিতে হাঙ্গর ধরা পড়ে। মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে অন্তত ১৬ প্রজাতির সামুদ্রিক হাঙ্গর রয়েছে। এর মধ্যে ‘কামট’ নামে পরিচিত এক ধরনের হাঙ্গর দক্ষিণাঞ্চলের নদীমোহনায় ঢুকে পড়ে। তবে স্বাদুপানিতে কোনো হাঙ্গর স্থায়ীভাবে বাস করে না।

হাঙ্গরের পাখনার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনেক বেশি। ফলে অনেক জেলে হাঙ্গর ধরা পড়লে পাখনা কেটে নিয়ে দেহ সমুদ্রে ফেলে দেন। এতে প্রকৃত আহরণের হিসাব পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। হাঙ্গরের পাখনা শুকিয়ে (শুঁটকি) রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি রপ্তানির জন্য হাঙ্গরের চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। হাঙ্গরের শক্ত চোয়াল অলংকার হিসেবেও বিক্রি হয়। এসব কারণেই হাঙ্গর সংরক্ষণ কার্যত উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

মৎস্য গবেষকদের মতে, হাঙ্গর সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে অবস্থান করে। হাঙ্গরের সংখ্যা কমে গেলে সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। অন্যান্য মাছের প্রজাতিও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের এক গবেষক জানান, “হাঙ্গর ধীরে বংশবিস্তার করে। অতিরিক্ত আহরণ হলে প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো হাঙ্গর সংরক্ষণে কার্যকর নজরদারি নেই।”

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী বেশ কয়েকটি হাঙ্গর প্রজাতি সংরক্ষিত। তবে উপকূলীয় এলাকায় এই আইনের বাস্তব প্রয়োগ খুবই সীমিত। অবৈধভাবে ধরা ও পাচার হওয়া হাঙ্গর নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত তদারকির অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাঙ্গর ধরা পড়লে তা জীবিত অবস্থায় ছাড়ার বাধ্যবাধকতা, পাখনা কাটা ও, রপ্তানির ওপর কঠোর নজরদারি, জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি, হাঙ্গরের প্রকৃত মজুদ নিরূপণে গবেষণা, এসব উদ্যোগ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর থেকে হাঙ্গর মাছ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।