মে দিবসে বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ, মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক সংগঠনগুলো আজ মজুরি বৃদ্ধি, পেনশন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে সংহতি প্রকাশ করছে। সিউল থেকে জাকার্তা, ইস্তাম্বুল থেকে ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানী এবং যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও সমাবেশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব এ বছরের মে দিবসের আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

ইউরোপিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (ইটিইউসি), যা ৪১টি দেশের ৯৩টি শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করে, এক বিবৃতিতে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের দায়ভার কর্মজীবী মানুষ বহন করতে রাজি নয়। তারা মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের চাকরি ও জীবনযাত্রার মান হুমকির মুখে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে মে দিবস সরকারি ছুটি না হলেও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ‘মে ডে স্ট্রং’ জোটের ব্যানারে কর্মসূচি পালন করছে। ‘শ্রমিক বনাম বিলিওনেয়ার’ স্লোগান তুলে তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা করছে। দেশজুড়ে পদযাত্রা, বয়কট ও ‘নো স্কুল, নো ওয়ার্ক, নো শপিং’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে।

ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় বড় সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। বামপন্থী সংগঠন বায়ানের নেতা রেনাতো রেয়েস বলেন, জ্বালানির দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে। শ্রম ফেডারেশন সেন্ট্রোর নেতা জোশুয়া মাতা বলেন, “বর্তমান সংকট বৈশ্বিক এবং এর প্রভাব সরাসরি শ্রমিকদের জীবনে পড়ছে।”

ইন্দোনেশিয়ায় শ্রমিক ইউনিয়নগুলো ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে সতর্ক করেছে। দেশটির ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট সাইদ ইকবাল বলেন, অনেক শ্রমিক এখন কষ্টে দিন পার করছেন।

পাকিস্তানেও মে দিবস সরকারি ছুটি হলেও অনেক দিনমজুরের পক্ষে তা পালন করা সম্ভব হয় না। ইসলামাবাদের কাছে নির্মাণ শ্রমিক মোহাম্মদ মাসকিন বলেন, “কাজ না করলে ঘরে খাবার নিয়ে যাব কীভাবে?” আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা শ্রমজীবী মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

ফ্রান্সে ‘রুটি, শান্তি ও স্বাধীনতা’ স্লোগানে মে দিবস পালিত হচ্ছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শ্রমিকদের জীবনে পড়ায় এই স্লোগান নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। একই সঙ্গে মে দিবসে কিছু খাতের কর্মীদের কাজের অনুমতি দেওয়ার সরকারি প্রস্তাব নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ইতালিতে সরকার প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরোর কর্মসংস্থান প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, যার লক্ষ্য তরুণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। তবে বিরোধীরা একে ‘প্রচারমূলক পদক্ষেপ’ বলে সমালোচনা করেছে।

পর্তুগালে শ্রম আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব ঘিরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইউনিয়নগুলোর অভিযোগ, নতুন প্রস্তাবে শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে এবং ওভারটাইমের সীমা বাড়ানো হবে। গত বছর থেকেই সেখানে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ চলছে।

মে দিবসের শিকড় ১৮৮৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিক আন্দোলনে। সে সময় আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করেন। শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে এক বিক্ষোভে বোমা বিস্ফোরণ ও পুলিশের গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে এই আন্দোলনের স্মরণে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বিশ্বজুড়ে আজকের এই বিক্ষোভগুলো সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা। শ্রমিকদের দাবি—বর্ধিত জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।