বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ভরসা সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম | সাতক্ষীরা প্রতিনিধি :বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ। বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ আহরণ করে দেশের প্রায় অর্ধ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করছে। একই সঙ্গে জাতীয় আয়, রপ্তানি এবং পুষ্টি নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখছে এই খাত। তবে টেকসই ব্যবস্থাপনার অভাবে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ আজ নানা সংকটের মুখে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশ জলসম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। সারাদেশে বিস্তৃত নদ-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও পুকুরের পাশাপাশি দক্ষিণে রয়েছে ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা ও বিশাল বঙ্গোপসাগর। দেশের সমুদ্রসীমা ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত, যার আয়তন প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার। এই সামুদ্রিক জলভাগ দেশের মোট জলসম্পদের প্রায় ৭৮ শতাংশ।

জাতীয় অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। স্থূল জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) মৎস্য খাতের অবদান প্রায় ৪ শতাংশ এবং কৃষি খাতে এর অংশ প্রায় ২১ শতাংশ। জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪ শতাংশ আসে মৎস্য খাত থেকে। দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদার প্রায় ৫৮ শতাংশই পূরণ হয় মাছের মাধ্যমে। এই খাতে সার্বক্ষণিক ও খণ্ডকালীন মিলিয়ে এক কোটিরও বেশি মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে।

বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদন অভ্যন্তরীণ ও সামুদ্রিক—এই দুই উৎসে বিভক্ত। অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে আসে মোট উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং সামুদ্রিক উৎস থেকে আসে প্রায় ২০ শতাংশ। তবে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম হওয়ায় এ খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, লবস্টার, কাঁকড়া ও কাছিমসহ বিপুল জীববৈচিত্র্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ প্রজাতির মাছ বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইলিশ একাই সামুদ্রিক মাছ উৎপাদনের বড় অংশ জুড়ে আছে। কিন্তু নির্বিচারে মা ইলিশ ও জাটকা নিধনের কারণে ইলিশের উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা ও সাতক্ষীরাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শতাধিক মৎস্য ও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত শিল্প। যদিও এসব শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ে বড় ভূমিকা রাখছে, কাঁচামালের সংকটে এখনো উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও নিবিড় চাষ পদ্ধতি বাড়ানো গেলে এই সংকট কাটানো সম্ভব।

তবে সামুদ্রিক মৎস্য খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। অতিরিক্ত আহরণ, উপকূলীয় এলাকায় মাছ ও চিংড়ির পোনা নিধন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় অতিরিক্ত মাছ ধরায় গভীর সমুদ্রের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সামুদ্রিক জরিপ, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সক্ষমতা বৃদ্ধি, অভয়াশ্রম কার্যকর করা এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মৎস্যজীবী, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাসহ সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা ছাড়া এই সম্পদ টেকসই রাখা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ যে বড় ভরসা—তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই সম্পদ রক্ষা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষের ওপরই বর্তায়। নইলে সম্ভাবনাময় এই খাত ভবিষ্যতে বড় সংকটে পড়তে পারে।