
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে। শহরের অন্য প্রান্তে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও সাতক্ষীরার শিল্পীপাড়ায় যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে ব্যস্ততা। আঠার গন্ধ, বাঁশ কাটার শব্দ আর রঙের উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে চারপাশ। সবকিছুতেই স্পষ্ট—দরজায় কড়া নাড়ছে পয়লা বৈশাখ।
উৎসবকে বরণ করতে দিনরাত এক করে কাজ করছেন স্থানীয় চারু ও মৃৎশিল্পীরা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কজুড়ে চলছে বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। বাঁশ ও কাঠের কাঠামোর ওপর কাগজের স্তর বসিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে বাঘ, হাতি ও নানা লোকজ মোটিফ। প্রতিটি রঙে, প্রতিটি নকশায় যেন ফিরে আসছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ।
শহরের প্রাণকেন্দ্র মিনিমার্কেটে শিল্পী রফিকুল ইসলাম তুলির শেষ টান দিতে ব্যস্ত। ক্লান্তি থাকলেও চোখে তৃপ্তি। তিনি বলেন, “কয়েক দিন ধরে ঘুম নেই। তবে আবহাওয়া ভালো থাকায় কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। এই কাজের মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের ঐতিহ্য তুলে ধরতে চাই।”
শুধু দৃশ্যশিল্প নয়, সংগীতেও চলছে প্রস্তুতি। কণ্ঠশিল্পী চৈতালি মুখার্জী বললেন, “পয়লা বৈশাখ আমাদের শিকড়ে ফেরার দিন। এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়, বাঙালির সংস্কৃতি ও সম্প্রীতি এখনো অটুট।”
শোভাযাত্রার প্রস্তুতির টানে শহরে ভিড় করছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও। ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর (ডিবি) বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. এমাদুল ইসলাম সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে এসে বলেন, “এই উৎসব পুরোনো ক্লান্তি ঝেড়ে নতুনকে বরণ করার। তাই এটি সবার উৎসব।”
শুধু শোভাযাত্রার প্রতিকৃতি নয়, সমান ব্যস্ততা দেখা গেছে মৃৎপল্লিগুলোতেও। সরাচিত্র, মাটির হাঁড়ি, খেলনা—সবকিছুতেই লেগেছে রঙের ছোঁয়া। লাল, নীল, হলুদ ও সবুজের মিশেলে ফুটে উঠছে মাছ, ফুল ও পাখির নকশা। কারিগরদের হাতে যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে গ্রামীণ জীবনের গল্প।
বৈশাখ ঘিরে বাড়ছে মাটির গয়নার চাহিদাও। স্থানীয় উদ্যোক্তা পারভিন আক্তার জানান, তরুণীদের পছন্দের তালিকায় এখন মাটির গয়নাই শীর্ষে। বৈশাখী থিমে তৈরি কানের দুল, নেকলেস ও চুড়ির অর্ডার সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
সব আয়োজনের ভেতরেও সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে অপেক্ষা—নতুন বছরের প্রথম সূর্যের জন্য। শিল্পীদের হাতের ছোঁয়া, মানুষের ব্যস্ততা আর উৎসবের আমেজে সাতক্ষীরা যেন ধীরে ধীরে উচ্চারণ করছে—‘এসো হে বৈশাখ’।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাত দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। এ ছাড়া থাকবে লাঠিখেলা ও অন্যান্য লোকজ আয়োজন। জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার বলেন, “সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ। আশা করছি, উৎসবটি আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হবে।”
