নারী নেতৃত্বে বদলে যাচ্ছে উপকূলের জীবনকথা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা খুলনার দাকোপ উপজেলা এক সময় ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম অভিঘাতে জর্জরিত জনপদ। একইভাবে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার তৃণমূল নারীরাও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় নানা রোগে আক্রান্ত হলেও তারা বসে থাকেননি; প্রতিদিনের জীবিকা নির্বাহের জন্য নানামুখী কাজে যুক্ত হয়েছেন।

ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পর নোনাপানির আগ্রাসনে এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি দীর্ঘদিন অনাবাদি পড়ে ছিল। মাঠে ধান জন্মাত না, জীবিকার উৎস হারিয়ে মানুষ হতাশায় দিন কাটাত। হারিয়ে গিয়েছিল হাসি, থমকে গিয়েছিল জীবন।

কিন্তু সেই দৃশ্যপট এখন আর আগের মতো নেই। খুলনার দাকোপ উপজেলার চরডাঙ্গা কিংবা তিলডাঙ্গা গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সবুজের সমাহার। বাঁশের মাচায় ঝুলে থাকা লাউ, সারি সারি ঢেঁড়স, বেগুন, টমেটো এবং পাশাপাশি ঝিলমিল করা মাছের ঘের। একসময় যে জমি ছিল বিরানভূমি, তা এখন হয়ে উঠেছে শস্য উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র। আর এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে জলবায়ু সহনশীল কৃষি পদ্ধতি ও একদল অদম্য নারীর নিরলস পরিশ্রম।

উপজেলার চরডাঙ্গা গ্রামের গৃহবধূ চিত্রা রানী রায় ছিলেন তাঁদেরই একজন। দিনমজুর স্বামীর সামান্য আয়ে কোনোরকমে চলত সংসার, যেখানে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। জলবায়ু সহনশীল কৃষি বিষয়ে প্রশিক্ষণই বদলে দিয়েছে তাঁর জীবনের গতিপথ। এখন তিনি নিজেই জমি লিজ নিয়ে সবজি চাষ করছেন এবং নিজের আয় নিজেই করছেন।

চিত্রা রানী বলেন, “আগে ছিল শুধু টিকে থাকার লড়াই। এখন পরিশ্রমের ফল পাই। আমি এখন একজন কৃষক, একজন উদ্যোক্তা।” তাঁর চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস, কণ্ঠে জীবনের দৃঢ়তা।

দাকোপ উপজেলার মতো উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম আঘাত লাগে কৃষিতে। লবণাক্ততার কারণে ধানসহ প্রচলিত ফসল টিকে থাকত না। তবে এখন কৃষকরা শিখছেন বিকল্প পথ—বাঁধের ওপর সবজি চাষ, জৈব সার ও খড়ের মালচ ব্যবহার, লবণসহনশীল সবজি এবং মাছের সমন্বিত চাষ। এসব কৌশল একদিকে যেমন ফলন বাড়িয়েছে, অন্যদিকে একই জমি থেকে তৈরি করেছে বহুমুখী আয়ের সুযোগ।

তিলডাঙ্গা গ্রামের কৃষক সুকুমার মল্লিক বলেন, “আগে একবার ঘূর্ণিঝড় এলেই সারা বছর ঋণে ডুবে থাকতাম। এখন মাছ আর সবজি একসঙ্গে চাষ করায় ঝুঁকি কমেছে। ক্ষতি হলেও পুরোপুরি ভেঙে পড়তে হয় না।”

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো নারীর অংশগ্রহণ। দাকোপে নারী কৃষকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তারা এখন আর শুধু ঘরের কাজেই সীমাবদ্ধ নয়, মাঠেও সমানভাবে সক্রিয়। জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রকল্পের মাধ্যমে তারা শিখেছেন কম জমিতে বেশি উৎপাদন, জৈব সার তৈরি, ফসল সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ।

তিলডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জালালউদ্দিন গাজী বলেন, “এক সময় এখানে লবণাক্ততার কারণে ফসল হতো না। এখন মানুষ প্রযুক্তি শিখে নিজের জমি কাজে লাগাচ্ছে। নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, এতে পরিবার ও সমাজে স্থিতি এসেছে।” তিনি আরও জানান, কৃষি আয় বাড়ায় এলাকায় অপরাধপ্রবণতা কমেছে, শিক্ষার হার বেড়েছে এবং সামাজিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে সরকার ও বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দাকোপে জলবায়ু সহনশীল জীবিকা উন্নয়নে কাজ করছে। সংস্থাটির প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. মাছুমুর রহমান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য আয়ের বৈচিত্র্য তৈরি করা, যেন দুর্যোগ এলেও মানুষ পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যেন দ্রুত জীবিকায় ফিরে আসতে পারে—সেই সক্ষমতা গড়ে তোলাই আমাদের উদ্দেশ্য।”

তিনি জানান, সংস্থাটির সহায়তায় শতাধিক পরিবার এখন নিজস্ব জৈব সার উৎপাদন করছে এবং অনেক নারী স্থানীয় বাজারে সরাসরি সবজি বিক্রি করছেন।

খুলনা কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দাকোপ উপজেলায় প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষক জলবায়ু সহনশীল চাষাবাদে যুক্ত হয়েছেন। মাছ ও সবজির উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কেউ কেউ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সেচের কাজে ব্যবহার করছেন এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন স্মার্ট ফার্মিংয়ের দিকে।

দাকোপের এই পরিবর্তন কেবল কৃষির নয়, এটি সামাজিক পুনর্জাগরণের গল্প। আয় বাড়ায় নারীরা এখন সংসারের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাদের সন্তানরা স্কুলে যাচ্ছে, পারিবারিক কলহ কমেছে এবং বেড়েছে আত্মসম্মান।

তবে স্থানীয়দের মতে, এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে আরও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে টেকসই বাঁধ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার এবং উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা জরুরি।

ইউপি চেয়ারম্যান জালালউদ্দিন গাজী বলেন, “কৃষকরা এখন কাজ করতে জানে। সরকার যদি বাজার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে, তাহলে দাকোপ হতে পারে দেশের সবুজ উপকূলের একটি মডেল।”

প্রতিদিন প্রভাতের আলোয় চরডাঙ্গা গ্রামের মাঠে নামেন চিত্রা রানী ও তাঁর সঙ্গীরা। কাঁধে ঝুড়ি, চোখে স্বপ্ন। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুখে ফুটে ওঠে হাসি। উপকূলের বাতাসে ভেসে বেড়ায় নতুন আশার গল্প।

দাকোপের এই গল্প প্রমাণ করে—স্থানীয় জ্ঞান, নারী-পুরুষের সমন্বিত উদ্যোগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব মিললে জলবায়ু অভিযোজন শুধু সম্ভবই নয়, তা হয়ে উঠতে পারে টেকসই উন্নয়নের শক্ত ভিত।