
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দূর্যোগে নারীরাই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। অধিকাংশ সময় প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একমাত্র পুরুষ সদস্য দেশের বিভিন্ন স্থানে জীবিকা অর্জনের জন্য কাজ করতে চলে যাচ্ছেন। ফলে অভিভাবকশূন্য পরিবারটির সব দায়িত্ব পড়ে যাচ্ছে নারীর উপর। অনেক সময় কাজের সন্ধানে বাইরে থাকা স্বামীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারে না নারী। ফলে দিন দিন তাদের পারিবারিক বন্ধন ক্ষীণ হতে থাকে। তাছাড়া অনেকে সময়মতো সাংসারিক খরচ পাঠাতে পারে না। এতে বাড়িতে থাকা নারীকে সংসার সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। আবার অনেক বিধবা নারীর পরিবারে উপার্জন করার মতো কোন লোক না থাকাই সমস্ত দায়িত্ব ঐ নারীকেই নিতে হচ্ছে। নারীর দায়িত্ব তখন সংসার সামলানোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবন ধারনের জন্য অর্থ উপার্জন করার দায়িত্ব ওই নারীকেই নিতে হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় তাকে। ফলে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। আর নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার কারণে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।
উপকূল অঞ্চলে নদী ভাঙ্গন ও নানা ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে এবং লবণ পানির চিংড়ি ঘেরের দাপটের কারণে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়ছেন। এদের বেশির ভাগই কৃষি বা প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল মানুষ। পুরুষ শ্রমিকরা কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে গেলেও বেশির ভাগ সময় নারী শ্রমিকরা বাড়িতে বেকার পড়ে থাকেন। অর্থ উপার্জনের বিকল্প কোন পথ না থাকায় নারীরা তখন বাধ্য হচ্ছেন নদীতে মাছের রেনু পোনা সংগ্রহ করতে।
উপকূল অঞ্চলের শ্যামনগর উপজেলার ঝাঁপা গ্রামের একাদশী মন্ডল (৪৬) বলেন, ‘অনেক সময় ভোর রাতে নদীতে জাল টানতে গেলে খুব ভয় লাগে। নদীতে কামট, কুমোর, সাপ, সোস থাকে আবার হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে যখন তখন ঝড় উঠতে পারে যে কোন মুহুর্তে বিপদ আসতে পারে। তাছাড়া নদীর পানির ভিতর সবুজ রঙ্গের কিরাল সাপ (সাপটি লম্বা হয় ৩/৪ ফুট এবং চওড়া হয় ২/৩ ইঞ্চি) থাকে কামড় দিলে মানুষ বাঁচে না। শুধু সংসার চালাতে ভয়ডর বাদ দিয়ে নদীতে পোনা ধরতে নামতে হচ্ছে।’ পাখিমারা গ্রামের বিধবা নারী নুরনাহার (৪৮) বলেন, ‘হ্যাচারীর মালিকরা সাগর থেকে মা মাছ ধরে নিচ্ছে এবং তাছাড়া নদী মরে যাচ্ছে। তাই সাগর থেকে মাছ উপরের দিকে আসতে পারছে না। যে কারণে নদীতে মাছ ও পোনা কম পড়ছে। তাছাড়া নদীতে জেলের সংখ্যা ও বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যদি ১০ জন জাল টানতো কিন্তু বর্তমানে ১০০ জন জাল টানছে।’
অন্যদিকে কামালকাটি গ্রামের সীতা রাণী মন্ডল (৪৯) বলেন, ‘প্রতিদিন ৪/৫ ঘণ্টা লবণ পানিতে থাকার কারণে গা হাত পা চুলকায়, পানির ভিতর নোনা পোকা থাকে সেটা গায়ে লাগলে ঘা হয়ে যায় এবং প্রচুর জ্বালা করে। উরুতে এক ধরনের জাওয়ালী (ফুসকড়ি) বের হয় হাটতে গেলে খুব জ্বালা করে। সমস্ত গায়ে ঘা-পাঁচড়া, এজমা, গা-পা ফোলা, পায়ে কুনুক (নখের কুনি বসা), হাটুতে ব্যাথা, হাত পা খেয়ে যায়, সর্দি জ্বর, মাথা যন্ত্রণা করে। বছরে একটা মোটা টাকা চিকিৎসার পিছনে ব্যয় করতে হয়।’
বন্যাতলা গ্রামের সাবানা খাতুন (২৯) মোমেনা বেগম (৪৭), গড়কুমারপুর গ্রামের মিজানুর রহমান (৪৮),পশ্চিম বিড়ালাক্ষী গ্রামের জহুরা বেগম (৪৫),পদ্মপুকুর গ্রামের রেশমা বেগম (৩০) জানান, বিকল্প আয়ের পথ না থাকায় বাধ্য হয়ে তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে চিংড়ীর পোনা আহরণ করছেন। প্রতিদিন ভাটার সময় ছোট জাল দিয়ে শুধু বাগদার পোনা আহরণ করেন। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে যে অর্থ পান তা দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে আছেন। গোনমুখে ভাটার সময় ২০০ থেকে ৩০০ টাকার চিংড়ি পোনা আহরণ করেন। উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ চিংড়ি পোনা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাঁরা মনে করেন, নদী থেকে চিংড়ি পোনা আহরণ বন্ধ রাখতে হলে তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন সমুদ্র উপকূলের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। নদীতে ভেসে আসা ‘সাদা সোনা’–খ্যাত বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রি করে তাঁদের ভাগ্য বদলেছে। সেই সঙ্গে বদলেছে তাঁদের জীবনযাত্রাও।
কয়রা উপজেলার সুন্দরবনের গা–ঘেঁষা জোড়শিং গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন। তিনি বলেন, একসময় সুন্দরবনের কাঠ কেটে গৃহস্থের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বেচতেন। এ থেকে যা পেতেন, তা দিয়ে কোনোমতে চলত সংসার। যেদিন কাঠ কাটা বন্ধ থাকত, সেদিন উপোস থাকতে হতো। তবে এখন আর সুন্দরবনের কাঠের ওপর ভরসা করতে হয় না। নদীর পানিতে ভেসে আসা সাদা সোনায় (রেণু) তাঁদের ভাগ্য বদলেছে।
সম্প্রতি উপকূল এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, সুন্দরবনের গহিনের নদী থেকে উজানে ভেসে আসা বাগদা ও গলদার রেণু পোনা ধরার জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অসংখ্য নারী-পুরুষ নেট দিয়ে তৈরি একধরনের জাল পেতে অপেক্ষা করছেন। কেউ নৌকায় বসে মাঝনদীতে জাল পেতেছেন। কেউ আবার নদীতীরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত জাল টেনেই চলেছেন। মাঝেমধ্যে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে জালে আটকে পড়া ক্ষুদ্রাকৃতির গলদা ও বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা নদীর চরে রাখা গামলাতে উঠিয়ে রাখছেন।
কয়রা উপজেলার কাশিরহাটখোলা ও মদিনাবাদ লঞ্চঘাট–সংলগ্ন এলাকার জেলেদের কাছ থেকে রেণু পোনা কিনে এনে তা জড়ো করেছেন ফড়িয়ারা। সেখান থেকে অন্য ফড়িয়ারা পোনা কিনে মাছের ঘেরে পৌঁছাচ্ছেন। আবার সরাসরি ঘেরমালিকেরাও রেণু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। রেণু আহরণকারী জেলেদের থেকে ঘেরমালিকদের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত দামের পার্থক্য হয় দুই থেকে তিন শ টাকা। আবার দূরে কোথাও রেণু পৌঁছাতে দামের তারতম্য দ্বিগুণ হয়। বর্তমানে প্রতি হাজার রেণু বিক্রি করা হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকায়।
চিংড়ির রেণু ধরেই চলছে তাঁর সংসার। ছোটবেলা থেকেই বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু ধরেন তিনি।
নদী থেকে চিংড়ির রেণু আহরণ শেষে চামচে তুলে বিক্রির জন্য গুনে গুনে আলাদা করছেন। সম্প্রতি কয়রা উপজেলার কাশিরহাটখোলা এলাকায়
জেলেদের ভাষ্য, বছরের অধিকাংশ সময় বাগদার রেণু পাওয়া গেলেও চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ—এই তিন মাস গলদার রেণু পাওয়া যায় উপকূলের নদীতে। এই তিন মাস জেলেদের জন্য বিশেষ সময়। কারণ, বাগদার রেণুর তুলনায় গলদার রেণুর দাম অনেক বেশি। এ জন্য গলদার রেণু ধরার মৌসুমের জন্য জেলেরা অপেক্ষায় থাকেন।
কয়রার কপোতাক্ষ নদের তীরের গাজীপাড়া গ্রামের আবদুর রহমান বলেন, চিংড়ির রেণু ধরেই চলছে তাঁর সংসার। ছোটবেলা থেকেই বাগদা ও গলদা চিংড়ির রেণু ধরেন তিনি। এখন বাগদার রেণু ধরছেন। এসব ধরে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হয়। শুধু তিনি নন, কপোতাক্ষ নদের তীরে এমন হাজারো মানুষ চিংড়ির রেণু ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিনি আরও বলেন, এগুলো বিক্রি করতে বাইরে কোথাও যেতে হয় না। ফড়িয়ারা এখান থেকেই কিনে নিয়ে যান। পরে তাঁরা বিভিন্ন আড়ত ও ঘের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন।
কয়রার উপকূল এলাকার ৩০টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর ৬০ শতাংশ পরিবার রেণু ধরা ও ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর নির্ভরশীল।
সম্প্রতি সুন্দরবনসংলগ্ন কাটকাটা গ্রামে গিয়ে শাকবাড়িয়া নদীতে অনেক নারী-পুরুষকে পিঠে দড়ি বেঁধে জাল টানতে দেখা যায়। সেখানে জাল নিয়ে নদীতে নামছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা সুষমা রানী মণ্ডল। আলাপকালে তিনি বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ ধরে যা আয় হয়, তাতেই চলে তাঁর সংসার। নদী থেকে ধরা চিংড়ির রেণুগুলো খুব ভালো হয়। বড় ঘের ব্যবসায়ীরা সব কিনে নিয়ে যান।
সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার পেশাজীবীদের নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংস্থা প্রতিবেশ অ্যাকটিভিটিজ। সংস্থাটির প্রকল্প সমন্বয়ক মো. আলাউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে কয়রার উপকূল এলাকার ৩০টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ চিংড়ির রেণু আহরণ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর ৬০ শতাংশ পরিবার রেণু ধরা ও ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে সুন্দরবনের ওপর চাপ কমেছে। অভাব-অনটনের এ জনপদের মানুষের সচ্ছলতা ফিরে আসার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এসব চিংড়ির রেণু। ১০ বছর আগের তুলনায় এই জনপদ এখন অনেক সমৃদ্ধ।
চিংড়ির রেণু চামচে তুলে বিক্রির জন্য গুনে গুনে আলাদা করছেন। সম্প্রতি কয়রা উপজেলার কাশিরহাটখোলা এলাকায়
কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার দাস এই প্রতিবেদককে বলেন, যাঁরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, এমন ১৩ হাজার ৫২৬ জন জেলেকে মৎস্যজীবী কার্ড দেওয়া হয়েছে। তবে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার নদ-নদীতে এভাবে অপরিকল্পিত পন্থায় মাছের পোনা আহরণকে মৎস্য সম্পদের জন্য অনেকটা হুমকি হিসেবে দেখছেন তিনি। কারণ হিসেবে মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, অনভিজ্ঞ জেলেরা বাগদা ও গলদার পোনা আহরণের সময় অন্য প্রজাতির মাছের পোনাও নষ্ট করে ফেলেন। এ জন্য জেলেদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।
