
বিশেষ প্রতিনিধি | নোয়াখালী : নোয়াখালী জেলাজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে কিশোর অপরাধী চক্র বা ‘কিশোর গ্যাং’। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে জেলা শহরের প্রধান সড়ক—সবখানেই এখন এদের দাপট। নিজেদের নামে গ্রুপ তৈরি করে দেয়ালে দেয়ালে চিকা মারা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে অস্ত্রের মহড়া ও শক্তি প্রদর্শনী। উঠতি বয়সে নিজেদের ‘হিরো’ সাজাতে গিয়েই মূলত এসব ভয়ংকর অপরাধে জড়াচ্ছে তারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলাজুড়ে বর্তমানে দুই শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। ‘এসটিজি’, ‘বিটিআর’—এমন নানা অদ্ভুত নামে চলছে এসব গ্রুপ। এদের লাগামহীন অপরাধ প্রবণতায় চরম উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও এলাকাবাসী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন।
গত এক বছরে নোয়াখালী জেলায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন। প্রায় প্রতিদিনই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে একাধিক গ্রুপ।
গত ৩০ মে রাতে সদর উপজেলার দাদপুরে ফরহাদ নামে এক কিশোরের সঙ্গে পাশের বাড়ির কিশোরদের দ্বন্দ্বের জেরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় ফরহাদকে বাঁচাতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের নির্মম আঘাতে প্রাণ হারান তার চাচা কামাল।
ছোট ভাই কামালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন বড় ভাই আবুল কালাম।
তিনি বলেন, “আমার ভাইকে আমি আর কোনোদিন পাবো না। আমার ভাই শেষ হয়ে গেল। হসপিটালে জ্ঞান ফেরার পর ডাক্তাররা শেষ জবাব দিয়ে দিয়েছিল। আমি এখন কার কাছে বিচার চাইব?”
ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমি ওদের জিজ্ঞেস করেছিলাম—কামাল ভাইকে তোরা মারছিস কেন? সমস্যা কী? এই কথা বলতেই ওরা আমাকেও মারধর শুরু করে। মূলত কামাল মামা যখন ফরহাদকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দেন, তখনই ওনার ওপর চড়াও হয়ে মাথায় আঘাত করা হয়।”
সহিংসতার এখানেই শেষ নয়। একই রাতে বেগমগঞ্জ উপজেলার শরিফপুরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণ হারান জোবায়ের হোসেন রাকিব নামে এক যুবক। এর আগে গত ৪ এপ্রিল সদর উপজেলার দাদপুরেই কিশোর গ্যাংয়ের মারধরে সেলিম নামে এক স্থানীয় ব্যবসায়ী নিহত হন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই কিশোর অপরাধ চক্রগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো মাদক। এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের নোয়াখালীতে এখন যেখানে-সেখানে পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এদের হাত ধরেই এলাকায় কোকের বোতলের মতো পানির দরে মাদক বিক্রি হচ্ছে। ওয়ালের পাশে, জঙ্গলের পাশে বসে এরা গাঁজা খায় ও বিক্রি করে।”
আরেকজন ভুক্তভোগী জানান, প্রতিবাদ করলে উল্টো প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “ওদের কিছু নিষেধ করলে বলে—তোদের মেরে ফেলব। বাড়ি বা রাস্তা থেকে কীভাবে বের হোস, আমরা দেখে নেব।”
এলাকাবাসীর স্পষ্ট অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে পুলিশ এদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে না। অনেক সময় পুলিশ আটক করলেও অদৃশ্য ইশারায় বা ‘তদবিরের’ কারণে সহজেই ছাড়া পেয়ে যায় এই কিশোর অপরাধীরা। ফলে ভয়ে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে চান না।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ না থাকায় অনেক সময় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, “নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য আমাদের কাছে আসছে। আমরা নিয়মিত তালিকা ধরে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এর বাইরেও থানা পুলিশ এবং আমাদের গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) টিম নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। কিশোর অপরাধে জড়িত কাউকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এই অপরাধ দমনে পুলিশ ফ্রন্ট লাইনে থাকবে।”
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কেবল পুলিশি অভিযান বা গ্রেপ্তার করে কিশোর গ্যাং কালচার পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে কিশোরদের এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে।
