সুন্দরবন উপকূল: লোনা পানি আর দুর্যোগে নুইয়ে পড়া শৈশব

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ দিন আগে

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এখন এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকট উপকূলের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের পথ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।

সুন্দরবন উপকূলীয় বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, শরণখোলাসহ ৯টি উপজেলার পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক। গত এক দশকে বরফ গলার হার চার গুণ বেড়ে যাওয়ায় উপকূলের স্থলভাগ সংকুচিত হচ্ছে। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম হলেও, উপকূলের শিশুদের জন্য এ ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

লবণাক্ততায় বন্দী জীবন ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উপকূলের শিশুদের জীবনে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের অনেক এলাকায় পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ১০ পিপিটি পর্যন্ত। বিশুদ্ধ পানির অভাবে শিশুরা বাধ্য হয়ে লোনা পানি পান করছে, যার ফলে তারা বিভিন্ন পানিবাহিত ও জটিল স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ৫৩ শতাংশ জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত। লবণের কারণে আবাদি জমিগুলো অনুর্বর হয়ে পড়ায় কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে পরিবারের আয় ও শিশুর পুষ্টির ওপর।

বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের দুষ্টচক্র প্রাকৃতিক দুর্যোগে বারবার সহায়-সম্বল হারিয়ে উপকূলের অসংখ্য পরিবার চরম দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে না পেরে অনেক অভিভাবক তাদের কিশোরী মেয়েকে বাল্যবিবাহ দিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ৫০ শতাংশ হলেও উপকূলীয় এলাকায় এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ইউনিসেফ ও স্থানীয় বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় জেলাগুলোতে এই হার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে, অভাবের তাড়নায় শিশুরা পড়াশোনা ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামতে বাধ্য হচ্ছে। দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এই শিশুশ্রমকে আরও ত্বরান্বিত করছে। পরিবারগুলো শিশুর পড়াশোনাকে ‘অলাভজনক’ মনে করায়, জলবায়ু উদ্বাস্তু এসব শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

বাস্তুচ্যুতি ও মানসিক স্বাস্থ্য ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বাংলাদেশে ১৫ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে এসব পরিবার শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। শরণার্থী হিসেবে শহরের বস্তি বা রেললাইনের পাশে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে এসব শিশু। ইউনিসেফ জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৪৬ কোটি শিশু উচ্চ তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।

প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুত কার্যকর সমাধান বের না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হবে। লবণসহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সুপেয় পানির আধার তৈরি জরুরি। পাশাপাশি, ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং খাল-জলাধার পুনঃখনন করে পানিপ্রবাহ সচল রাখার কোনো বিকল্প নেই।

উপকূলের শিশুদের একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী উপহার দিতে হলে জলবায়ু অভিযোজন ও জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সময় এখনই। প্রকৃতিকে বাধাগ্রস্ত করার ফল যে ভয়াবহ, তা উপকূলের বর্তমান চিত্রই বলে দিচ্ছে।