উপকূলের আইলে টমেটো, সাতক্ষীরায় ৫৩ কোটি টাকার উৎপাদনের আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : একসময় চিংড়ি ঘেরের লোনা পানির ধারে সরু আইলগুলো পড়ে থাকত অনাবাদি। এখন সেই আইলজুড়ে লাল-সবুজ টমেটোর সমারোহ। জলবায়ুর প্রতিকূলতা পেরিয়ে কৃষকের উদ্ভাবন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় টমেটো চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

চলতি মৌসুমে জেলায় টমেটো উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৩২০ টন। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৫৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, গত বছর ১৩২ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ হলেও এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫২ হেক্টরে। বিশেষ করে কলারোয়া, তালা, দেবহাটা ও সদর উপজেলার ঘেরপাড়ের আইলগুলোতে এই চাষ বিস্তৃত হয়েছে।

উপকূলীয় এই অঞ্চলে লবণাক্ততা, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি ও খরার কারণে দীর্ঘদিন চাষাবাদ কঠিন ছিল। কৃষকেরা গত কয়েক বছরে উঁচু বেড তৈরি, পলিথিন শেড ব্যবহার এবং ড্রিপ সেচ প্রযুক্তি প্রয়োগ করে এসব জমিতে টমেটো চাষ শুরু করেন। এতে গাছের শিকড় লবণাক্ততা থেকে সুরক্ষিত থাকে এবং রোগবালাইও কমে।

দেবহাটার কৃষক বদরুল ইসলাম বলেন, “পলিথিন শেডে খরচ বেশি, কিন্তু সুবিধা অনেক। বৃষ্টি-গরমে গাছ নষ্ট হয় না, ফলন ভালো হয়।”

কলারোয়ার চাষি আলী রশিদ জানান, এক বিঘা জমিতে টমেটো চাষে খরচ হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। বাজার ভালো থাকলে বিক্রি হয় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকার মতো। খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা।

তালা উপজেলার কৃষক আব্দুর রশিদ ও মিঠাবাড়ির আবেদ আলীও জানান, আগাম জাতের টমেটো তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যায়।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বারি-৮সহ বিভিন্ন উন্নত জাতের টমেটো চাষে ফলন ও বাজারদর—দুটিই ভালো পাওয়া যাচ্ছে।

টমেটো চাষে স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও বেড়েছে। কলারোয়ার শ্রমিক সামছুল আলম বলেন, “আগে ঘেরে কাজ কম ছিল। এখন টমেটো চাষে নিয়মিত কাজ পাচ্ছি।”

দেশে উৎপাদন কমে যাওয়ায় টমেটোর চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে ২২ হাজার ৪১৬ টন টমেটো আমদানি হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১৪০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

কৃষি বিভাগ মনে করছে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে আমদানির চাপ কমবে এবং বাজারদর স্থিতিশীল থাকবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “জলবায়ুর ঝুঁকি থাকলেও কৃষকেরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তা মোকাবিলা করছেন। কলারোয়া ও তালা উপজেলায় ফলন বিশেষভাবে ভালো হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে ঘেরাঞ্চলের এই চাষ জাতীয় বাজারেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে উঁচু বেড, পলিথিন শেড, ড্রিপ সেচ ও লবণাক্ততা-সহনশীল জাত ব্যবহার করে টেকসইভাবে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

কৃষকেরা বলছেন, প্রয়োজন সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন। এসব নিশ্চিত হলে সাতক্ষীরার টমেটো চাষ দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।