
স্বল্প বিনিয়োগে বেশি লাভ, বাড়ছে চাষ
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার উপকূলজুড়ে বদলে যাচ্ছে চাষের চিত্র। এক সময়ের ‘সাদা সোনা’ খ্যাত বাগদা চিংড়ির ঘেরগুলোতে এখন বাড়ছে কাঁকড়ার দখল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভাইরাসের আক্রমণ ও বাজারদরের অস্থিরতায় চিংড়ি চাষে ক্ষতির মুখে পড়া কৃষকেরা ঝুঁকছেন কাঁকড়া চাষে। স্বল্প বিনিয়োগে দ্রুত লাভ এবং রপ্তানির ভালো বাজার থাকায় এই ঝোঁক বাড়ছে দিন দিন।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় ৩২১ হেক্টর জমিতে কাঁকড়া চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার মেট্রিক টন। সাত বছর আগে যেখানে মাত্র ৫০ হেক্টর জমিতে কাঁকড়া চাষ হতো, সেখানে এখন তা ছয় গুণ বেড়েছে।
শ্যামনগর উপজেলার দাতনেখালী গ্রামের চাষি বিপুল দাস আগে ১০ বিঘা জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করতেন। কিন্তু প্রায় প্রতি বছরই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে ঘের প্লাবিত হওয়ায় মাছ ভেসে যেত। পাশাপাশি ভাইরাসের আক্রমণে চিংড়ি মারা যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। এখন সেই জমির একটি অংশে কাঁকড়া চাষ করছেন।
একই এলাকার রায়হান মল্লিক বলেন, “খাঁচা পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষে লাভ বেশি। আমার ঘেরে ৭০০টি খাঁচা আছে। প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়।”
শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী এলাকার খামারি শাওন আহমেদ জানান, এ বছর তার খামারে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৬ মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। বাজারেও ভালো দাম মিলছে। বর্তমানে বড় আকারের (এ গ্রেড) কাঁকড়া প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া এলাকার ব্যবসায়ী শ্যামল পাল বলেন, “এ গ্রেডের কাঁকড়া ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, বি গ্রেড ৬৫০-৭৫০ টাকা এবং সি গ্রেড ৫০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”
তিনি জানান, এসব কাঁকড়া মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে রপ্তানি করা হয়।
‘সফট শেল’-এর চাহিদা বেশি
আশাশুনির খামারি বিরূপাক্ষ পাল জানান, কাঁকড়া চাষে খাঁচা পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়। খাঁচায় রেখে তেলাপিয়া মাছসহ বিভিন্ন খাদ্য খাওয়ানোর পর ১৯-২০ দিনের মধ্যে কাঁকড়া খোলস ছাড়ে। তখন সেটি ‘সফট শেল’ হিসেবে বিক্রি করা হয়, যার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
তার খামারে বর্তমানে ১ হাজার ৬০০ খাঁচা রয়েছে। তিনি আশা করছেন, চলতি মৌসুমে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার ব্যবসা হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম সেলিম বলেন, সাতক্ষীরায় কাঁকড়া চাষ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে প্রধান সমস্যা হলো পোনার সংকট। অধিকাংশ পোনা সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করতে হয়। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় চাষিরা সমস্যায় পড়েন।
তিনি বলেন, “দেশে সরকারি একটি হ্যাচারি কক্সবাজারে রয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে আরও হ্যাচারি গড়ে তোলা জরুরি।”
৮০-এর দশকে উপকূলীয় অঞ্চলে শুরু হওয়া চিংড়ি চাষ একসময় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস ছিল। কিন্তু ৯০-এর দশক থেকে ভাইরাসসহ নানা রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারমূল্য কমে যাওয়ায় এ খাত মারাত্মক চাপে পড়ে।
এ অবস্থায় অনেক চাষি চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়া চাষ শুরু করেছেন। কেউ কেউ পুরোপুরি কাঁকড়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছেন।
খুলনার পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের রামপাল-মংলা এলাকায় দেখা গেছে, পুকুরে মোটাতাজাকরণ, চিংড়ির সঙ্গে মিশ্র চাষ এবং খাঁচা পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষ দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা এবং আধুনিক হ্যাচারি স্থাপন করা গেলে কাঁকড়া খাত থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
