
নাজমুল হোসেন : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহ্যবাহী ভুলুয়া নদী এখন দখল, অবৈধ বাঁধ নির্মাণ ও পলি জমে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একসময়ের প্রমত্ত এই নদী এখন অনেকটাই মরা খালে পরিণত হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা আর শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতার কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন রামগতি ও কমলনগর উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থেকে উৎপত্তি হয়ে প্রায় ৭১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্মীপুর সদর, কমলনগর ও রামগতি উপজেলার ভেতর দিয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে ভুলুয়া নদী। একসময় নদীটির গড় প্রস্থ ছিল প্রায় ৫০০ মিটার। কিন্তু দখল ও পলি জমার কারণে বর্তমানে তা কমে গিয়ে মাত্র ৮৫ মিটারে নেমে এসেছে।
এক সময় বড় বড় সাম্পান নৌকা ও জাহাজ চলাচল করত এ নদীতে। নদীতে ছিল নানা প্রজাতির দেশি মাছের সমাহার। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে নদীটি খনন না হওয়ায় এখন শুষ্ক মৌসুমে অনেক স্থানে হেঁটেই পার হওয়া যায়। বর্ষা মৌসুমে আবার উল্টো চিত্র—জোয়ার ও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায় আশপাশের গ্রাম।
রোববার (৮ মার্চ) সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর বিভিন্ন স্থানে পলি জমে নাব্যতা কমে গেছে। নদীর দুপাশ দখল করে তৈরি করা হয়েছে মাছের ঘের, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও কোথাও বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। ফলে নদীতে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, নদীতে অবৈধ দখল ও বাঁধ নির্মাণের কারণে জোয়ার-ভাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা ইরি-বোরো আবাদ করতে পারছেন না। আবার বর্ষা মৌসুমে পানি বের হতে না পারায় তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এতে দুই মৌসুমেই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষকরা।
গত দুই বছরে বন্যা, অস্বাভাবিক জোয়ার ও টানা বৃষ্টিতে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। রামগতি উপজেলার চরগাজী, চররমিজ, চরআলগী, চরপোড়াগাছা ও চরবাদাম ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে চরপোড়াগাছা ও চরবাদাম ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা দীর্ঘদিন পানির নিচে ছিল।
একই সময় কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা, চরলরেন্স, তোরাবগঞ্জ ও হাজিরহাট ইউনিয়নের অন্তত ১২টি গ্রাম পানিতে ডুবে যায়। অনেক পরিবার বেড়িবাঁধের ঢাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। দুই উপজেলার আমন বীজতলা, রোপা আমনক্ষেত, পুকুর, খাল-বিল ও সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট নদীর বিভিন্ন অংশ দখল করে মাছের ঘের তৈরি, অবৈধ বাঁধ নির্মাণ এবং বসতবাড়ি নির্মাণ করেছে। নদীর সংলগ্ন খাল দখল, পানিপ্রবাহ বন্ধকারী জাল বসানো এবং পোল ও কালভার্টের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার কারণেও পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, রামগতির হাজীগঞ্জ বাজারসংলগ্ন স্লুইসগেট এলাকাও দখল করে রাখা হয়েছে। নদী রক্ষায় একাধিকবার মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানান তারা।
কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা গ্রামের কৃষক হোসেন, হাবিব উল্যাহ, গোলাম সারোয়ার ও সবুর খানসহ কয়েকজন বলেন, এক সময় এই নদীতে বড় নৌকা চলাচল করত এবং মাছ ধরেই অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। এখন নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করায় নদীটি প্রায় দখল হয়ে গেছে। নদীতে জোয়ার-ভাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষি ও জীবিকা উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। নদীটি দ্রুত খননের দাবি জানান তারা।
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী নাহিদ-উজ্জামান খান বলেন, ভুলুয়া নদী খননের জন্য মন্ত্রণালয়ে কয়েকবার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, তাঁর জন্মস্থান ভুলুয়া নদীর তীরবর্তী চরকাদিরা ইউনিয়নে। এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনায় নিয়ে নদীটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, ১৯৯৬ সালে শেষবার নদীটি খনন করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে খনন না হওয়ায় নদীটি প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, ভুলুয়া নদী খননের বিষয়ে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নদীটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের আশা, দ্রুত নদীটি দখলমুক্ত করে খনন করা হলে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার কৃষিকাজে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগও অনেকাংশে কমে আসবে।
