
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি | বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে দেশের উপকূলীয় মানুষকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার চাপে দিন দিন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় জনপদ। এতে কৃষি, মৎস্য, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্য ও বসবাস—জীবনের প্রতিটি স্তরেই সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দশকে সাতক্ষীরা অঞ্চলে তিন শতাধিক ছোট-বড় খাল ভরাট হয়ে অস্তিত্ব হারিয়েছে। এক হাজার ৫৫ হেক্টরের বেশি ফসলি জমি নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে। জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি ক্রমেই অকৃষিজমিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কোথাও ফসলি জমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে ইটভাঁটির জন্য, আবার কোথাও নদীগর্ভ থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার, জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামো, হারিয়ে যাওয়া খাল পুনঃখনন এবং খালের উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করা গেলে লবণাক্ততা কমিয়ে কৃষি উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব। তবে এখন পর্যন্ত নেওয়া উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
মৎস্যখাতে ঝুঁকি বাড়ছে
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বিনয় কুমার রায় বলেন, জিউধরা, বহরবুনিয়া, নিশানবাড়ীয়া ও পঞ্চকরন ইউনিয়নে বর্তমানে আট হাজার ৭৫০টি গলদা ও এক হাজার ২৭৬টি বাগদা চিংড়ির ঘের রয়েছে। এ ছাড়া তিন হাজার ৭৬টি বিভিন্ন প্রজাতির সাদা মাছের পুকুর আছে।
তিনি জানান, অতিরিক্ত জোয়ারের পানিতে প্রায়ই এসব ঘের তলিয়ে যায়। এতে চাষিরা প্রতিবছর বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা গেলে এই ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সুপেয় পানির সংকট ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকায় অগভীর নলকূপে আর্সেনিক এবং গভীর নলকূপে অতিরিক্ত লবণাক্ততা ও আয়রনের সমস্যা রয়েছে। অনেক এলাকায় ৫০০ থেকে ৭০০ ফুট গভীর নলকূপ থেকেও লবণাক্ত পানি উঠছে। ফলে সুপেয় পানির সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
কিছু গ্রামে মাত্র এক বা দুটি বড় পুকুর পুরো এলাকার মানুষের পানির চাহিদা মেটায়। নারী ও শিশুরা সপ্তাহে একবার পাত্র নিয়ে সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করে। বর্ষা ছাড়া অন্য মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেও প্রয়োজন মেটানো যায় না।
নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যে ভয়াবহ প্রভাব
লবণাক্ত পানির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে উপকূলীয় নারীদের ওপর। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আশরাফি বিনতে আকরামের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে উপকূলীয় নারীরা অতিরিক্ত ঋতুস্রাব, সাদা স্রাব, যোনি ও জরায়ুর নানা সমস্যায় ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে অকাল গর্ভপাত, জরায়ু কেটে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটছে।
উপকূলীয় নারীদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘প্রেরণা’র নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামী বলেন, মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে ৩৮ বছর বয়সেই অনেক নারীর মেনোপজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, জলবায়ু পরিবর্তন–সংক্রান্ত বাজেটের বড় অংশ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হলেও নারীদের স্বাস্থ্য খাতে তেমন বরাদ্দ নেই।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস: নিত্যদিনের আতঙ্ক
বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশ ফানেল আকৃতির হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপকূলে ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিডর, আইলা, আম্ফান, ইয়াস ও রিমালের মতো ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় রিমালে প্রায় দুই লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয় এবং বেড়িবাঁধের চার শতাধিক স্থানে ভাঙন দেখা দেয়।
দুর্যোগের সময় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও সেখানে জায়গার সংকট, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের অভাব দেখা দেয়। গাদাগাদি করে মানুষ ও গবাদিপশু একসঙ্গে থাকতে বাধ্য হয়। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ডায়রিয়া, কলেরা ও চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ে।
টেকসই সমাধানের দাবি
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের মতো এলাকাগুলো তিন দিক থেকে নদীঘেরা। ভাঙাচোরা বেড়িবাঁধ আর নিয়মিত জোয়ার-ভাটাই এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। স্থানীয়দের দাবি, বারবার মেরামতের বদলে কংক্রিটের টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণই একমাত্র স্থায়ী সমাধান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া উপকূলীয় মানুষের এই দুর্দশা কাটবে না। টেকসই বেড়িবাঁধ, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে উপকূলীয় জনপদগুলো ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
