
সিরাজুল ইসলাম | সাতক্ষীরা : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাতক্ষীরা–২ আসনে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক উত্তাপ। দীর্ঘদিন ধরে জোট রাজনীতির প্রভাবে নিয়ন্ত্রিত এই আসনে এবার আর সেই পুরোনো সমীকরণ নেই। একসময় একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভোট চাওয়া বিএনপি ও জামায়াত এখন একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে আসনটি ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এবার সাতক্ষীরা সদর উপজেলা ও দেবহাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে সাতক্ষীরা–২ সংসদীয় আসন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতিতে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত ১২টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে চারবার জয় পেয়েছেন জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা। অতীতে বিএনপি–জামায়াত জোট থাকায় বিএনপির ভোটব্যাংক জামায়াত প্রার্থীদের জয়ে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। একইভাবে মহাজোটের সময় আওয়ামী লীগের সমর্থন জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে দেয়।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় সাতক্ষীরা–২ আসনের সমীকরণও পাল্টে যায়। জোট রাজনীতির সেই বন্ধন ভেঙে আলাদা শক্তি হিসেবে মাঠে নামে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি। ফলে একসময় ‘জামায়াতের আঁতুড়ঘর’ হিসেবে পরিচিত এই আসনে এখন কোনো দলই নিশ্চিতভাবে এগিয়ে নেই।
বিএনপি থেকে এই আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা শাখার সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রউফ। তিনি সদর উপজেলার আলিপুর ইউনিয়নের সাতবারের চেয়ারম্যান। অন্যদিকে জামায়াত মনোনয়ন দিয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি ও সাবেক জেলা আমির আব্দুল খালেককে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরার চারটি আসনের মধ্যে সাতক্ষীরা–২ আসনেই জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি সবচেয়ে শক্তিশালী।
জাতীয় পার্টির পক্ষে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে মাঠে রয়েছেন দলটির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান আশু। তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দলটির একক প্রার্থী হিসেবে তিনি আগের সংসদীয় অভিজ্ঞতা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
প্রচার-প্রচারণায়ও দেখা যাচ্ছে ভিন্ন কৌশল। বিএনপি তৃণমূল থেকে জেলা পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো সক্রিয় করেছে। জামায়াত ধর্মীয় ও সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তাদের ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক ধরে রাখার চেষ্টা করছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু না করলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
ভোটারদের মধ্যেও প্রত্যাশা ও ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। সাতক্ষীরা পৌরসভার জামায়াত অফিস এলাকার বাসিন্দা মুকুল হোসেন বলেন, ‘এবার দল নয়, প্রার্থীর যোগ্যতা দেখে ভোট দেব।’ দেবহাটার ব্যবসায়ী খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘নদীভাঙন আর লবণাক্ততার সমাধান দিতে পারলেই মানুষ তার পাশে থাকবে।’ নতুন ভোটার সাদিয়া পারভীন বলেন, ‘শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রার্থীরাও নিজেদের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন। বিএনপি প্রার্থী আব্দুর রউফ বলেন, ‘এই নির্বাচন শুধু জয়ের জন্য নয়, মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার লড়াই।’
জামায়াত প্রার্থী আব্দুল খালেক বলেন, ‘আমরা শুধু ভোটের সময় নয়, সংকটেও মানুষের পাশে থাকি।’
জাতীয় পার্টির আশরাফুজ্জামান আশু বলেন, ‘আগের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধারাবাহিক উন্নয়নই আমার লক্ষ্য।’
এর আগে বিএনপির সাবেক জেলা সদস্যসচিব আব্দুল আলীম স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও সোমবার এক ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার আগে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত তিনি নেননি।
সব মিলিয়ে সাতক্ষীরা–২ আসনে এবারের নির্বাচন জোট রাজনীতির বাইরে গিয়ে ব্যক্তি গ্রহণযোগ্যতা, উন্নয়ন ভাবনা ও সাংগঠনিক শক্তির বাস্তব পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
