
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখনো সুপেয় পানির তীব্র সংকটে ভুগছে। শহরের তুলনায় গ্রামে এক লিটার খাবার পানির দাম ৩০ থেকে ৪০ গুণ বেশি হলেও জীবন বাঁচাতে সেই পানি কিনেই খেতে হচ্ছে উপকূলবাসীকে। ফলে খাবার পানির ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষ—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনঘেঁষা গ্রাম গোলাখালী। স্বাধীনতার আগে গ্রামটিতে পানির তেমন সংকট ছিল না। স্থানীয়রা পুকুর সংরক্ষণ করে সেখানকার পানি ব্যবহার করতেন। তবে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর পুকুরগুলো লবণপানিতে প্লাবিত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। এরপর থেকেই তীব্র পানিসংকটে পড়েছে গ্রামটি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও উন্নয়নকর্মী মো. নূরুজ্জামান বলেন, বেসরকারি উদ্যোগে কিছু পানি প্রকল্প থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাঁর মতে, উপকূলের পানিসংকট সমাধানে রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জরুরি। তিনি বলেন, পানির অভাবে প্রতিদিন মানুষ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
সাতক্ষীরার সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার বলেন, উপকূলের মানুষ বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি খাচ্ছে। লবণপানির শোধনাগার স্থাপন এবং নদী–খাল দখলমুক্ত করা গেলে সংকট অনেকটাই কমবে।
উপকূল বিষয়ক গবেষক ও সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, উপকূল অঞ্চলে আগে পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে পানির সংকট মোকাবিলা করা হতো। কিন্তু বাঁধ নির্মাণ, নদী-খাল দখল এবং বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের কারণে লবণাক্ততা বেড়েছে। তাঁর মতে, গ্রামে গ্রামে পুকুর সংরক্ষণ ও কৃষি–চিংড়ি–বসতি জোনিং ছাড়া সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বনজীবী নেতা শেফালী বিবি বলেন, লবণাক্ত পানির কারণে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে হয়। পানির সংকটের কারণেই অনেক পরিবার অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
স্থানীয় শিক্ষক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা জানান, উপকূলের নদী-খাল-জলাশয়ের বড় একটি অংশ দখল ও দূষণের শিকার। পানিকে পণ্য হিসেবে না দেখে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তাঁদের।
সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, জেলার ২২ লাখ মানুষের পানিসংকটের ধরন এক নয়—কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও আর্সেনিক বা আয়রনের সমস্যা। সঠিক তথ্য ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
উপকূল দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চল হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততার আগ্রাসন ও কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত পানিসংকটের বোঝা বহন করছে। স্থানীয়দের মতে, পানির এই বৈষম্য নিরসনে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি।
