
নাজমুল হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদক : লক্ষ্মীপুর জেলার নৌ ও স্থলপথে যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র মজু চৌধুরী ঘাট। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ফেরিঘাট হিসেবে, এই ঘাট শুধু যাত্রী চলাচলের কেন্দ্র নয়—জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নির্মাণশিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সহায়কও বটে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত মজু চৌধুরী ঘাট দিয়ে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা মূল্যের বালু, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন হয়। এখানকার বালু মহল জেলার উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানায় স্থানীয় ঠিকাদার ও নির্মাণ–সংশ্লিষ্টরা।
তাদের ভাষায়, “লক্ষ্মীপুরের রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট কিংবা ভবন নির্মাণে যে বালু লাগে, তার বড় অংশ আসে মজু চৌধুরী হাট বালু মহল থেকে।”
স্থানীয় লোকজন বলছেন, এই বালু মহল না থাকলে জেলার নির্মাণ খাতে ব্যয় অনেক বেড়ে যেত। তখন বালু আনতে হতো চাঁদপুর বা কুমিল্লা থেকে, যা পরিবহন খরচ ও সময়—দুই-ই বাড়িয়ে দিত।
লক্ষ্মীপুরের পাশাপাশি নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন প্রকল্পেও এখানকার বালু ব্যবহার হয়। ফলে মজু চৌধুরী হাটকে শুধু স্থানীয় নয়, আঞ্চলিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে স্থানীয়রা বলছেন, ঘাট এলাকায় আরও উন্নত জেটি, রাস্তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। তাদের প্রত্যাশা—মজু চৌধুরী ঘাট শুধু নৌবন্দর নয়, ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক টার্মিনালে রূপ নিক।
ড্রাম ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি মহি উদ্দিন জনি বলেন, “এখানকার বালু মহল থেকে দৈনিক কয়েক শ’ ট্রাক বালু বিভিন্ন প্রকল্পে পাঠানো হয়। এই উৎস না থাকলে জেলার নির্মাণকাজ প্রায় অচল হয়ে যেত।”
স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতারাও বলছেন, মজু চৌধুরী ঘাট বালু মহল শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
বালু মহলের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, এই ঘাট থেকেই জেলার বেশির ভাগ নির্মাণ প্রকল্পে বালু সরবরাহ করা হয়। একজন বালু ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এখান থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বালু যায় লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ফেনী জেলায়। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও হচ্ছে। সরকার সঠিকভাবে তদারকি করলে রাজস্ব আয় আরও বাড়বে।”
বালু ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, “মজু চৌধুরী হাট বালু মহল বহু বছর ধরে স্থানীয় উন্নয়নকাজে অবদান রাখছে। এখানকার বালু ছাড়া রাস্তাঘাট বা সরকারি প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ করা প্রায় অসম্ভব।”
আরেকজন ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান লিটন বলেন, “বালু উত্তোলনে যদি কোনো সীমাবদ্ধতা আসে, তাহলে আমাদের ট্রাক চালক, শ্রমিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।”
বালু পরিবহনে জড়িত শ্রমজীবী মানুষরাও বলছেন, মজু চৌধুরী ঘাট তাদের জীবিকার মূল ভরসা।
ড্রাম ট্রাক চালক রাকবি বলেন, “এই ঘাট থেকে প্রতিদিন বালু নিয়ে যাই বিভিন্ন জায়গায়। এখানেই আমাদের রোজগার, সংসার চলে। যদি বালু ওঠানো বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমরা বেকার হয়ে যাব।”
আরেক চালক মো. আলম বলেন, “বালু ঘাটের কাজ বন্ধ থাকলে দিন চলে না। কাজ থাকলেই আমরা চালকদের আয় হয়, না হলে ঘরে না খেয়ে থাকতে হয়।”
একজন ম্যানেজার সিরাজ প্রধান বলেন, “বালু তুলতে না পারলে গাড়ি চলে না, গাড়ি না চললে পেট চলে না। ঘাটটা আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”
বালু টলারের মালিক কামরুল বলেন, “আমরা নদী থেকে সরকারি অনুমতি নিয়ে বালু তুলি। এখান থেকে যে বালু ওঠে, তা দিয়েই জেলার রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট ও বাড়িঘর তৈরি হয়। ঘাট বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের জীবিকা বন্ধ হয়ে যাবে।”
বালু টলারের মালিক আকবর বলেন, “নদীতে বালু না তুললে আমাদের নৌকা দাঁড়িয়ে যায়, ঘরে চুলা জ্বলে না। আমরা চাই সরকার নিয়ম ঠিক করে দিক, যেন কাজও হয়, পরিবেশও ঠিক থাকে।”
