
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : খুলনার কয়রা উপজেলার কাঠমারচর গ্রামের শরীফা খাতুনের বয়স এখন ২৮। কিন্তু জীবনের ভার যেন তাঁর কাঁধে দশকের চেয়ে অনেক বেশি। বাল্যবিয়ের পর থেকেই শুরু হয়েছিল সংগ্রাম—প্রথমে স্বামীর পরকীয়ার যন্ত্রণা, পরে দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু। এখন তিন সন্তানকে নিয়ে শরীফা একা। নদীর জলে জাল টেনে, কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করে কিংবা চিংড়ির ঘেরে মজুর হিসেবে দিন গুজরান করেন তিনি।
শরীফার মতো হাজারো নারী উপকূলে লড়ছেন প্রতিদিন। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন কিংবা দারিদ্র্য—সবই তাঁদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
কয়রার কাটাকাটি এলাকার মজিদা খাতুন আঙুল তুলে দেখালেন—“ওইখানে আছিল আমার ঘর। স্বামী-সন্তানদের লইয়া থাকতাম। এখন শুধু বাইনগাছ।”
সেই জায়গা এখন নদীর বুকের তলায়। মজিদা এখন বাঁধের ঢালে খুপরিঘরে থাকেন। ঘরের কোনা ছুঁয়ে পানি ওঠে জোয়ারে। পাশে তাঁর প্রতিবেশী জরিনা বেগম—দুই বছর ধরে একইভাবে বাঁধের ওপর বাস। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বসতভিটা হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। এমনকি তাঁর স্বামীর কবরটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
“আমরা গেরস্থদের হাঁস-মুরগির চেয়েও খারাপ থাকি,” বললেন মজিদা। “জোয়ার আসলে ছোট ছাওয়াল-মাইয়েগুলা ভয় পায়। তবু কোথায় যাব?”
গাতিরঘেরী এলাকার ধানক্ষেতে নারী শ্রমিকরা কাজ করছেন কড়া রোদে। সকাল সাতটা থেকে জমিতে আগাছা পরিষ্কার করছেন তাঁরা। কিন্তু মজুরি? পুরুষেরা পান ৪০০ টাকা, নারীরা মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।
তানজিলা খাতুন বলেন, “একটু দেরি করলি টাকা কাইটা দেয়। কিন্তু কাজ না করলি পেট চালামু কী দিয়া?”
বড়বাড়ি গ্রামের সাধনা রানী ও কল্পনা মণ্ডল বলেন, “আমরাও সারাদিন কাজ করি পুরুষদের মতোই। কিন্তু মজুরির কথা বললেই জমির মালিকেরা রেগে যায়। তাই মুখ বুজে কাজ করি।”
কয়রার ৬ নম্বর গ্রাম থেকে ছোট নৌকায় করে প্রতিদিন নারীরা যাচ্ছেন সুন্দরবনে। কেউ কাঁকড়া ধরতে, কেউ রেণুপোনা সংগ্রহে। বন বিভাগ থেকে অনুমতি না থাকলেও পেটের তাগিদে যেতে হয় তাঁদের।
বাসন্তী রানী বললেন, “এলাকায় কাজ নাই। সুন্দরবন না থাকলে বাঁচতাম না।”
কিন্তু এই কাজ বিপজ্জনকও বটে। বন বিভাগের অভিযান, বাঘের ভয়, এমনকি নদীতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি—সবই তাঁদের নিত্যসঙ্গী।
কয়রার গ্রামগুলোতে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। বাঁধের পাশে সারি সারি ঝুলন্ত টয়লেট, আর লবণাক্ত চিংড়িঘেরের পানি। নারী ও শিশুরাই প্রতিদিন বিকেলে কয়েক কিলোমিটার দূরের পুকুর থেকে কলসি ভরে পানি আনেন।
পুষ্প মুন্ডা বলেন, “আমাগো নারীরা এই পানির ঝক্কিতে খুব ভুগি। বাচ্চারা অসুখে পড়ে।”
স্বাস্থ্যকর্মী ফরিদা খাতুন জানান, নারীরা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লবণাক্ত পানিতে কাজ করেন। ফলে তাঁদের জরায়ু ও প্রজননজনিত রোগ বাড়ছে। কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক বলেন, “মাটি ও পানিতে অতিরিক্ত লবণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর অপুষ্টিই এসব রোগের মূল কারণ।”
বাঁধ হারানো, ঘর হারানো, স্বামী হারানো—সবই যেন উপকূলের নারীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবু তাঁরা থেমে থাকেন না। শরীফা খাতুন বলেন, “আমি চিংড়িঘেরে কাজ করি, বাচ্চাগুলারে স্কুলে পাঠাই। বাপ-দাদার ঘর নাই, কিন্তু স্বপ্ন আছে।”
উপকূলের এই নারীরা এখন শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন—প্রতিদিন, প্রতিটি ভোরে, প্রতিটি জোয়ারে।
