
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন—যা একদিকে জীববৈচিত্র্যের আধার, অন্যদিকে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা বলয়। কিন্তু ইতিহাসের গৌরব বয়ে চলা এই বন আজ জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও মানবসৃষ্ট চাপের মুখে ক্রমেই বিপন্ন হয়ে উঠছে।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার পলিমাটি জমে হাজার বছরের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে এই বদ্বীপ অঞ্চল। উত্তরের পর্বতশ্রেণি হিমালয় থেকে নেমে আসা বিপুল পলি দক্ষিণে এসে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিশেছে। সেই পলির স্তরে স্তরে জেগে ওঠা চরভূমিতে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় লবণসহিষ্ণু উদ্ভিদরাজি—ম্যানগ্রোভ।
সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার নিয়মিত প্রভাবে দিনে চারবার পানির ওঠানামা এই অরণ্যের প্রাণচক্র নির্ধারণ করে। লোনা ও মিঠা পানির অনন্য মিশ্রণে তৈরি হয় বিশেষ এক বাস্তুতন্ত্র—যা পৃথিবীর অন্য কোথাও এত বিস্তৃত আকারে দেখা যায় না।
সুন্দরবনের নামকরণ নিয়ে রয়েছে একাধিক মত। অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, ‘সুন্দরী’ গাছের নাম থেকেই ‘সুন্দরবন’। এই বনাঞ্চলের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী (Heritiera fomes)—যার কাঠ টেকসই ও মূল্যবান। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, ‘সমুদ্রবন’ শব্দের অপভ্রংশ ‘সুন্দরবন’। ইতিহাসবিদদের আরেকটি মত, প্রাচীন সুগন্ধা নদী ও তার তীরবর্তী বনভূমির নাম থেকেই এ নামের উৎপত্তি।
ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, বাংলার ইতিহাস মূলত নদীর ইতিহাস। খুলনা-সাতক্ষীরা-বাগেরহাট অঞ্চলের অসংখ্য নদ-নদী—বলেশ্বর, শিবসা, পশুর, রায়মঙ্গল—সবই শেষ পর্যন্ত সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নদীই সুন্দরবনের প্রাণরস। বর্ষায় উজান থেকে বয়ে আনা মিঠা পানি ও পলি বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখে। কিন্তু নদীর গতিপথ পরিবর্তন, নাব্যতা কমে যাওয়া এবং উজানে বাঁধ নির্মাণের ফলে মিঠা পানির প্রবাহ কমছে—বাড়ছে লবণাক্ততা।
সুন্দরবন শুধু গাছপালার বন নয়; এটি বন্যপ্রাণীরও নিরাপদ আশ্রয়। এখানে রয়েছে চিত্রা হরিণ, কুমির, নানা প্রজাতির পাখি ও জলজ প্রাণী। তবে বনটির বিশ্বখ্যাত পরিচয় এসেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য। ডোরাকাটা এই শিকারি শুধু বনের প্রতীকই নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যেরও সূচক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘের সংখ্যা ও চলাচল প্রাকৃতিক পরিবেশের স্বাস্থ্যের নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঐতিহাসিক দলিল ও পুরোনো মানচিত্রে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রাচীন বন্দর ও জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। পর্তুগিজ মানচিত্রকারদের আঁকা নথিতে উপকূলজুড়ে বাণিজ্যকেন্দ্রের চিহ্ন রয়েছে। সময়ের স্রোতে সেসব হারিয়ে গেলেও বন রয়ে গেছে প্রাকৃতিক প্রাচীর হয়ে।
১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়—এর অনন্য জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক গুরুত্বের কারণে।
আজকের সংকট
পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবন এখন চারটি বড় হুমকির মুখে—
১. লবণাক্ততা বৃদ্ধি: উজানে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরী গাছসহ বহু উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত।
২. জলবায়ু পরিবর্তন: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে।
৩. মানবসৃষ্ট চাপ: চোরাশিকার, বনজ সম্পদ আহরণ ও শিল্পায়নের প্রভাব।
৪. নদীর নাব্যতা হ্রাস: পলি জমে নদী ভরাট, ফলে পানিপ্রবাহ ব্যাহত।
উপকূলীয় মানুষ বলছেন, ঘূর্ণিঝড়ের সময় সুন্দরবনই তাদের রক্ষা করে। কিন্তু বন দুর্বল হলে সেই প্রাকৃতিক ঢালও ভেঙে পড়বে।
পরিবেশবিদদের মতে, সমস্যার সমাধান কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগে সম্ভব নয়; প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রকৃতিকে কেবল সম্পদ হিসেবে নয়, সহাবস্থানের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, বন উজাড় বন্ধ, টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা—এই চারটি পদক্ষেপ জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সুন্দরবন কেবল একটি বন নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশ-নিরাপত্তার শেষ প্রাচীর। ইতিহাস বলে, নদী বদলায়, ভূগোল বদলায়—কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাতের ফল শুভ হয় না।
সুন্দরবনের জন্ম হয়েছিল প্রকৃতির নিয়মে। এর বিকাশও হয়েছে সহাবস্থানের ভিত্তিতে। এখন প্রশ্ন—মানুষ কি সেই সহাবস্থানের পথে ফিরতে পারবে, নাকি ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদ কেবল স্মৃতিচিহ্ন হয়ে থাকবে?
