
সিরাজুল ইসলাম শ্যামনগর সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
পুরো সুন্দরবন জুড়ে এখন বিরাজ করছে জলদস্যু আতঙ্ক। দস্যুরা জেলে দেখলেই প্রথমে মারধর, পরে মুক্তিপণ চেয়ে অস্ত্রের মুখে করছে অপহরণ। দস্যুদের অত্যাচার আর নির্যাতনের ভয়ে সুন্দরবনে পেশা ছাড়তে শুরু করেছে জেলেরা। ফলে গত দুই মাসে পাস-পারমিট না হওয়ায় বন বিভাগের রাজস্ব আয় নেমেছে তিনের এক অংশে। প্রশাসন বলছে, জেলেদের নিরাপত্তা ও সুন্দরবন দস্যু মুক্ত করতে কাজ করছে তারা। এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্রসহ ৭ জলদস্যুকে আটক করেছে কোস্ট গার্ড। ভুক্তভোগী জেলে কোস্ট গার্ড জানায়, জেলেদের সাগর ও সুন্দরবনে মাছ আর কাকড়া আহরণে জীবন-জীবিকা নির্ভর করে কয়েক লক্ষ মানুষের সংসার। আর এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করছে সরকার। তাছাড়া সমুদ্রে মৎস্য সম্পদ আহরণ করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ গড়ে তুলছে এসব জেলেরা।
২০১৮ সালে ১ নভেম্বর দস্যু মুক্ত সুন্দরবন ঘোষনা হওয়ায় বেশ ভালই চলছিল জেলে-মহাজনদের জীবন। কিন্তু দীর্ঘ ৭ বছর পর আবারও নতুন করে সুন্দরবনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দয়াল, শরিফ, আছাবুর, হান্নান, ও মজনুসহ প্রায় ৬টি জলদস্যু বাহিনীর দল। তারা বনের মধ্যে জেলে দেখলেই অস্ত্রের মুখে মুক্তিপণ দাবিতে করছে অপহরণ। মুক্তিপণের টাকা না দিলে জেলে বহরে চালায় লুটপাট, হামলা ও মারধরসহ নানা অত্যাচার-নির্যাতন।
গত ৬ মাসে সাগর ও সুন্দরবনের পূর্ব রেঞ্জ থেকে প্রায় শতাধিক জেলে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি ২৬ জানুয়ারি দুবলার চর থেকে ১৫ জেলে অপহরণ করে দয়াল বাহিনীর সদস্যরা। জিম্মি করা এ সকল জেলেদের কাছে চাওয়া হচ্ছিল মোটা অংকের মুক্তিপণ। গত কয়েক দিনে মোট অংকের মুক্তিপণ দিয়ে জলদস্যুদের জিম্মিদশা থেকে ১০ জেলে ফিরে আসলেও এখনও ৫ জেলে রয়েছে দস্যুদের জিম্মায়। এরই মধ্যে কোস্ট গার্ডের অভিযোনে অস্ত্রসহ কয়েক দস্যুকে আটকও করা হয়েছে। ২৬ ফেব্র“য়ারি সুন্দরবনের কুখ্যাত হান্নান বাহিনীর প্রধান হান্নানসহ সাতজন জলদস্যুকে অস্ত্রসহ আটক করে মোংলা কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সদস্যরা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার রাতে বাগেরহাটের রামপাল খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়।
কোস্টগার্ড আরো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে হান্নান বাহিনী সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ, জেলে বহরে হামরা লুটপাট ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। স¤প্রতি তারা ডাকাতির পরিকল্পনা করছিল বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়। পরে বাহিনীর প্রধান মোঃ হান্নান শেখসহ সাতজনকে আটক করা হয়। পরে তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, বাঁশতলী এলাকা থেকে তার সেকেন্ট ইন কমান্ড মোঃ হাবিবুর রহমান (৫৫), সহযোগী মোঃ রেজাউল শেখ (৫৩), শেখ মোঃ কামাল উদ্দিন (৫৪), সুরত মলিক (৪৭), মোঃ আবু তালেব খান (৪৭) ও মোঃ হোসেন আলী শেখ (৫৫ কে আটক করা হয়। তারা খুলনা ও বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি একনলা বন্দুক, তিনটি রামদাসহ ব্যবহৃত অন্যান্য মালামাল উদ্ধার করা হয়।
অপর দিকে, জলদস্যুদের ভয়ে জেলেরা বনে না যাওয়ায় পাস-পারমিট প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে বন বিভাগের। মোংলা চাঁদপাই স্টেশনে যেখানে গত জানুয়ারি মাসে পাস হয়েছে ৯৬১টি, সেখানে ফেব্র“য়ারিতে হয়েছে মাত্র ৩৮৪টি পাস-পারমিট। ফলে বন বিভাগের রাজস্ব নেমে আসছে তিনের এক অংশে। অভিযান চলমান, অস্ত্রসহ আটক করা হয়েছে কয়েক জলদস্যুকে, জেলেদের নিরাপদে মাছ আহরণের জন্য বনে যাওয়া আর সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে কাজ করছে প্রশাসন।
পূর্ব সুন্দরবন-চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা দ্বীপন চন্দ্র দাস জানান, ফিড়ে আসা জেলেদের কাছ থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি, বর্তমানে সুন্দরবনে যে পরিমাণ বন জলদস্যু বিচরণ করছে তাতে জেলেরা আর বনে জীবিকা আহরণের জন্য যাওয়া সম্ভব না। কারণ জলদস্যুদের চাহিদা অনেক বেশী। তারা জেলেদের দেখলেই প্রথমে মারধর শুরু করে, পরে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে নিয়ে যায় গহীন বনে। সেখানে নিয়ে তাদের দিয়ে নৌকা চালানো কাজ করায়, পাশাপাশি ভাত-পানিও খেতে দেয় না। তাদের দাবিকৃত মুক্তিপণ দিতে না পারলে জেলেদের উপর চালানো হয় অমানষিক অত্যাচার আর নির্যাতন। তাই গত দুই মাসে জেলেরা পাশ নিয়ে আসেনা, ফলে সরকারি রাজস্বও কমে গেছে।
মোংলা-কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন কর্মকর্তা- লেঃ কমান্ডার তারেখ আহম্মেদ জানান, সুন্দরবনকে দস্যু মুক্ত করতে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকজন জলদস্যুসহ এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জন্য বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বেশ কিছু দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র। বুধবার ২৬ ফেব্র“য়ারি হান্নান বাহিনীর প্রধান হান্নানসহ ৭ জলদস্যুকে আটক করা হয়েছে উদ্ধার করা হয়েছে অস্ত্রও। আটককৃত জলদস্যুদের জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও জব্দকৃত অস্ত্রসহ তাদের সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ডের এ কর্মকর্তা।
২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধাপে ধাপে সুন্দরবনের মূর্তিমান আতঙ্ক ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গোলা-বারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছিল।
