
সিরাজুল ইসলাম : সুন্দরবনে বনদস্যু ও জলদস্যুর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় মধু আহরণে অনাগ্রহ দেখা দিয়েছে মৌয়ালদের মধ্যে। এতে একদিকে যেমন নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে জীবিকা সংকটে পড়তে পারেন হাজারো বনজীবী। এমন পরিস্থিতিতে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।
বুধবার (১ এপ্রিল) সকালে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সুন্দরবনের মধু আহরণ মৌসুমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বনদস্যুরা স্থানীয়দের আশপাশেই অবস্থান করছে। তাদের দমনে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয়দের তথ্য সহায়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি দস্যুদের শনাক্ত করে প্রশাসনকে তথ্য দেন, তাহলে যে কোনো মূল্যে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা হবে।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, দস্যু দমনে ইতিমধ্যে খুলনা সার্কিট হাউসে র্যাব, বিজিবি, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ডে মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, গত কয়েক বছরে মধু সংগ্রহ ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১ সালে যেখানে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে।
একইভাবে মৌয়ালের সংখ্যাও কমছে। ২০২৪ সালে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল মধু আহরণে অংশ নিলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজারে। চলতি মৌসুমে এ সংখ্যা আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে বাঘ ও কুমিরের ভয় থাকলেও এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক বনদস্যু। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার মৌয়াল শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে জঙ্গলে যাই, কখনো বাঘ-কুমিরের ভয় পাইনি। এখন সবচেয়ে বেশি ভয় ডাকাতের।’
একই এলাকার মৌয়াল আনছার আলী মোড়ল বলেন, ‘আগে আমরা সাতজন মিলে বনে যেতাম। এবার ডাকাতের ভয়ে কেউই যেতে চাইছে না।’
আরেক মৌয়াল বশির আলী মোড়ল বলেন, ‘নিরাপত্তা না থাকলে বাপ-দাদার পেশাও ছাড়তে হবে।’
বন বিভাগ জানিয়েছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ডের সঙ্গে যৌথ টহল জোরদার করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সুন্দরবনের মধুকে ভেজালমুক্ত রেখে ব্র্যান্ডিং করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি মৌয়ালদের উদ্দেশে বলেন, ‘মধু আল্লাহর নেয়ামত। এতে ভেজাল করা যাবে না।’ পাশাপাশি জেলেদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের মতো বিশেষ কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দস্যু আতঙ্ক অব্যাহত থাকলে শুধু মধু উৎপাদনই নয়, পুরো উপকূলীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, সুন্দরবন এলাকার বহু মানুষের জীবিকা সরাসরি মধু আহরণ ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।
