সাতক্ষীরা-ভেটখালী মহাসড়কের বেহাল দশা: ২২ লাখ মানুষের ভোগান্তিতে ‘মরণফাঁদ’

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৪ দিন আগে

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা : ‘সাতক্ষীরার আকর্ষণ, সড়ক পথে সুন্দরবন’—স্লোগানটি এখন শুধুই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। সাতক্ষীরা-শ্যামনগর হয়ে ভেটখালী পর্যন্ত ৬২ কিলোমিটার দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক ‘মরণফাঁদ’। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম গাফিলতি আর ধীরগতির কারণে দীর্ঘ তিন বছর ধরে চলছে উন্নয়নযজ্ঞ, যার ফলে অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়েছেন এই অঞ্চলের প্রায় ২২ লাখ মানুষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, শ্যামনগর বাস স্ট্যান্ড থেকে কালিগঞ্জের মৌতলা পর্যন্ত সড়কের বিশাল অংশে দীর্ঘদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ি করে রাখা হয়েছে। বালু ও ইটের খোয়া মিশ্রিত এই সড়ক গত কয়েকদিনের বর্ষায় কাদা-পানিতে একাকার হয়ে গেছে। দূরপাল্লার যানবাহন তো দূরের কথা, সাধারণ ভ্যান বা রিকশা চলাচল করাও এখন দুঃসাধ্য। স্থানীয় ভ্যানচালক ইয়াসিন হোসেন বলেন, “রাস্তায় ভ্যান চালানোই এখন দায়। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা হয়ে যায়, খোয়াগুলো সরে গিয়ে চাকা আটকে যায়। আমাদের উপার্জন বন্ধ হওয়ার উপক্রম।”

অগ্রগতি মাত্র ৩০ শতাংশ, মেয়াদ শেষের পথে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্যমতে, সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণের এই প্রকল্পের আওতায় ৬২.৩২৫ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৬৫ কোটি টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ৩০ জুন। অথচ তিন বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ৩০ শতাংশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জহিরুল লিমিটেড’সহ সংশ্লিষ্টদের ধীরগতির কারণে কাজের এই বেহাল দশা।

অথচ একই সড়কের পার্শ্ববর্তী প্যাকেজের কাজ যারা করছেন, তারা সময়মতো পাথরের লেয়ার দিয়ে রুলার দেওয়ায় বৃষ্টিতেও রাস্তা চলাচলের উপযোগী রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিকী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সব প্যাকেজের কাজ একই সময়ে শুরু হলেও কেবল তদারকির অভাবে একটি অংশ ভালো আর অন্য অংশ কাদা-পানিতে ডুবে থাকছে। এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার বহিঃপ্রকাশ।”

প্রতিদিন চার উপজেলার মানুষের আহাজারি সড়কটি দিয়ে চলাচলকারী শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাটা ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলার অন্তত ১৫ থেকে ২২ লাখ মানুষ প্রতিদিন ঝুঁকির মধ্যে চলাচল করছেন। বড় বড় খানাখন্দের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সড়ক ও জনপদ বিভাগ ১৬টি স্থানে ইটের সোলিং করে কোনোমতে চলাচলের ব্যবস্থা করলেও সেটি এখন চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পথচারী গোলাম সরোয়ার ও মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “রাস্তা খুঁড়ে ফেলে রাখায় ধুলাবালিতে শ্বাসকষ্ট বাড়ছে, আর বৃষ্টি হলে কাদার কারণে হাঁটাই দায়। দিনের বেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। রাতের বেলা জনবল বাড়িয়ে কাজ করলে হয়তো এই ভোগান্তি কিছুটা কমতো।”

কী বলছে প্রশাসন? সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার পারভেজ বলেন, “সড়ক সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে। জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও ধীরগতির কারণে আরও সময় লাগতে পারে। তবে কালিগঞ্জ থেকে ভেটখালী পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্ত করার দাবিটি আমাদের নজরে আছে। আমরা নতুন একটি প্রকল্পের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠাব।”

সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই মহাসড়কের বেহাল দশা নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর।