সাতক্ষীরায় শোল মাছ চাষে জাকিরের সাফল্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোরের পত্রিকা
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।শোল মাছ চাষে সাফল্য পেয়েছেন সাতক্ষীরার জাকির হোসেন। দুটি পুকুরে দেশি জাতের শোল মাছের চাষ করেন তিনি। কম খরচে এক বছরে পাঁচ কাঠা জমিতে এক টন শোল মাছ উৎপাদন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করা জাকির হোসেন বিলুপ্তপ্রায় শোল মাছের প্রজাতি টিকিয়ে রাখতে কাজ করছেন।

জাকির হোসেন বলেন, ‘কীটনাশক ও সার ব্যবহারের ফলে কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, টেংরা, পুঁটি, মলা, ঢেলা, চেলা, শাল চোপরা, শোল, বোয়াল, আইড়, বাইন, খলিসা,  চিংড়ি, গজার,  চেং, টাকি, চিতলসহ দেশীয় অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কৃষক পরিবারের জন্ম হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে কৃষি আমাকে টানতো। লেখাপড়া শেষ করে ধানের বীজের ব্যবসা শুরু করি। ব্যবসা ভালো চলছিল। ২০১৫ সালে এসে ধানের বীজের জন্য চাতাল বানাতে গিয়ে দুটি পুকুর খনন হয়ে যায়। সেখানে কি মাছ চাষ করবো সেই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বই পড়তে থাকি। অধিকাংশ বইতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে অচাষকৃত রাক্ষুসে মাছ নিধন করুন। সহজে না মরলে বিষ দিয়ে নিধন করুন। আর নিধন করার কথা বলা হয়েছে দেশি মাছগুলো। মাছে-ভাতে বাঙালির প্রিয় মাছগুলো নিধন করে পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, নাইলোটিকা চাষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমার মধ্যে জিদ হলো, বিলুপ্ত মাছ চাষ করে সবাইকে দেখিয়ে দেব। সেই থেকে শোল মাছের চাষ শুরু করি।

এই দেশের মতো মাটি এবং পানি কোথাও নেই উল্লেখ্য করে জাকির হোসেন বলেন, ‘তাহলে আমি কেন মাছ চাষে অন্য দেশের কাছ থেকে টেকনোলজি ধার নেবো। দেশি চ্যাং, শোল এবং বোয়াল মাছ যদি রাক্ষুসে হয় তাহলে অন্যগুলো হাঙ্গর। শোল, চ্যাং, বোয়াল মাছগুলোকে আমি খুব ভালোবাসি। মমতা দিয়ে দেশি মাছ চাষ করে সাফল্য পেয়েছি। প্রথমে অনেকে আমাকে পাগল বলে আখ্যা দিয়েছিল। এখন অনেকে এই দেশি মাছ চাষে ঝুঁকে পড়ছে। দেশি মাছ চাষে খরচ কম লাভ বেশি। মানুষের কাছেও প্রিয় এই মাছগুলো।’

শোল মাছ চাষ সম্পর্কে জাকির হোসেন বলেন, ‘এই অঞ্চলের মাছ চাষিরা যেসব মাছ চাষের প্রতি ঝুঁকছে তাতে ঝুঁকি আছে এবং খরচও বেশি। কিন্তু তারা বোঝে না দেশীয় মাছ চাষে বেশি কষ্ট করা লাগে না। মানুষ যাকে পুকুরের অন্যান্য মাছের জন্য শত্রু মনে করেন আমি তাকে বন্ধু ভেবে নিয়েছি। এর নার্সিং কিংবা একটু বড় হলেই পোনা লালনের দায়িত্ব মা মাছটির। এজন্য বাড়তি কোনও কাজের দরকার পড়ে না।

তিনি আরও জানান, ‘দেশীয় মাছ চাষ করতে পুকুরে কোনও সার দেওয়া দরকার হয় না। চুন কিংবা কোনও রাসায়নিক খাবারও নয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে মাছগুলো বেড়ে ওঠে। বাজারের ছোট মাছই এর প্রধান খাদ্য। সকাল-বিকাল খাবার দিতে হয়।’

জাকির তার বাড়িতে গড়ে তুলেছেন গুড়পুকুরের রিসার্চ ইনস্টিটিউিট। পুকুরে শোল মাছের চাষ এরই অধীনে বলে জানান তিনি। ধীরে ধীরে বোয়াল, আইড়, গজারসহ সব দেশি মাছ চাষ করবেন বলে জানান।শোল মাছকে আমরা ‘রাক্ষুসে মাছ’ বলে থাকি। শোল মাছ বাজারের দামি মাছ। এই মাছ দামি হলেও চাষে খরচ খুবই কম। শোল মাছ সব ধরনের দুর্যোগ বা প্রতিকূল পরিস্থিতি সহ্য করতে পারে। মা শোল মাছই নিজেদের মতো করে ডিম নার্সিং ও পোনা লালন করে।

পোনা মজুত বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে শোল মাছ চাষ না হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহের ওপর জোর দিতে হবে। বৈশাখ মাস শোল মাছের প্রজনন মৌসুম। বৈশাখ মাসের প্রথম থেকে শোল মাছ বাচ্চা দিতে শুরু করে। বাচ্চাগুলো এক ঝাঁকে থাকে। সেই সময় হাওর-বাঁওড়, পুকুর থেকে সপ্তাহখানেক বয়সের বাচ্চা সংগ্রহ করতে হবে। পোনা পাওয়া না গেলে বড় শোল মাছ সংগ্রহ করে পুকুরে ছেড়ে দিতে হবে। এককভাবে প্রতি শতাংশে ১০টি দেয়া যেতে পারে। মিশ্র পদ্ধতিতে চাষের জন্য প্রতি শতাংশে ৪টি। একটি প্রাপ্তবয়স্ক শোল মাছ লম্বায় ২.৫-৩ ফুট হতে পারে।

পুকুর প্রস্তুতি যে কোনো পুকুরেই শোল মাছ চাষ করা যায়। তবে তাকে উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। যে পুকুরে শোল চাষ হবে সে পুকুরে কচুরিপানা অথবা কলমিলতা থাকলে ভালো হয়। কারণ শোল মাছ আড়ালে থাকতে পছন্দ করে। তবে কচুরিপানায় যেন পুকুর ভরে না যায়। পুকুরের চারদিকে কমপক্ষে ৫ ফুট উচ্চতায় জাল দিয়ে বেড়া দিতে হবে। তা না হলে বর্ষাকালে শোল মাছ লাফিয়ে চলে যাবে।

খাদ্য হিসাবে শোল মাছ সাধারণত খৈল বা কুড়া দিয়ে বানানো খাবার খায় না। ছোট মাছই এর প্রধান খাদ্য। পোনা মাছের প্রিয় খাদ্য শুঁটকির গুঁড়া। সেজন্য পোনা মাছকে খাবার হিসেবে চিংড়ি শুঁটকির গুঁড়া ভালোভাবে পিষে দিতে হবে।

এভাবে ১৫ দিন খাওয়ানোর পর পোনাগুলো প্রায় ২/৩ ইঞ্চি হবে। ২/৩ ইঞ্চি পোনা মজুদের পর খাদ্য হিসেবে কার্পজাতীয় মাছের ধানীপোনা দেয়া যেতে পারে; সঙ্গে ছোট ছোট ব্যাঙ বা ব্যাঙাচি দেয়া যেতে পারে। আর বড় মাছের জন্য ছোট ছোট মাছ, তবে মরা টাটকা মাছ খেতে দিলে এরা খুব খায়।

মিশ্র চাষ আমাদের দেশে শোল মাছের একক চাষের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ এত কাঁচা মাছ, শুঁটকি, ব্যাঙ বা ব্যাঙাচি জোগান দেয়া সম্ভব নয়। তাই মিশ্র মাছের সঙ্গে শোল মাছের চাষ করা যেতে পারে। ৬ মাসে একেকটি শোল মাছের ওজন ৭০০-১০০০ গ্রাম হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

রোগ হিসাবে শীতকালে শোল মাছে ক্ষত রোগ দেখা দেয়। তাই ওই সময় মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন।

মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি বা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত। না হলে আগামী কয়েক বছর দেশীয় মাছের চিহ্ন খুঁজে পাবে না জনগণ।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসার জিএম সেলিম এই প্রতিবেদককে ‌বলেন, এখানকার মাটি ও আবহাওয়ার কারণে সব ধরনের মাছ উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে গত কয়েক বছর ধরে চিংড়িঘেরের সঙ্গে সাদা মাছ চাষ করছেন চাষিরা। তাছাড়া পৃথকভাবেও সাদা মাছ উৎপাদন হচ্ছে সাতক্ষীরায়। চলতি মৌসুমে সাদা মাছের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, উৎপাদন তার চেয়ে অনেক বেশি। দেশীয় মাছ রক্ষার জন্য ইতোমধ্যে নানা ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সদরের জাকির হোসেন ব্যক্তি উদ্যোগে শোল মাছ চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। তার সাফল্য দেখে জেলার অনেক যুবক শোল মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।’