
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা শহরে তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার পাইপলাইনে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির জন্য হাহাকার চলছে। খাবার পানির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহারেও পানি না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের হাজারো মানুষ।
শহরের ইটাগাছা, কামালনগর, রসুলপুর, মুনজিতপুর, দক্ষিণ কাটিয়া, লস্করপাড়া ও মাস্টারপাড়া এলাকাসহ বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে পানির জন্য মানুষের দুর্ভোগের চিত্র। অনেক গৃহিণীকে খালি কলস ও বালতি নিয়ে এ-পাড়া থেকে ও-পাড়া ঘুরে পানি সংগ্রহ করতে দেখা যায়। বিশেষ করে ১, ৩, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে সংকট সবচেয়ে বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক মাস ধরে তারা নিয়মিত পানি পাচ্ছেন না। আগে মাঝে মাঝে পাইপলাইনে পানি এলেও বর্তমানে সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এতে গোসল, শৌচাগার ব্যবহারসহ নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কাটিয়া মাস্টারপাড়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পানির অভাবে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে ভ্যানে করে ড্রামভর্তি পানি কিনে আনছেন। প্রতি ড্রাম পানির জন্য খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।
ইটাগাছা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা খাবার ও ব্যবহারের পানির জন্য মারাত্মক সংকটে রয়েছেন। বিকল্প উপায়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। তাদের অভিযোগ, সাতক্ষীরা পৌরসভা কার্যত অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়েছে এবং সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা হালিমাতুজ সাদিয়া বলেন, “সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু পানির চিন্তায় থাকতে হয়। কল দিয়ে পানি আসে না, টিউবওয়েলের পানিও খাওয়ার উপযোগী নয়। আমরা কি শুধু কর দেওয়ার জন্যই কষ্ট সহ্য করব?”
এদিকে সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে এ ধরনের সংকট দেখা দিলেও স্থায়ী কোনো সমাধান করা হচ্ছে না। অবিলম্বে গভীর নলকূপ স্থাপন এবং আধুনিক পানি শোধনাগার সচল করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলী নূর খান বলেন, শহরের অধিকাংশ পুকুর ভরাট করে অপরিকল্পিত আবাসন গড়ে ওঠায় পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। মানুষ বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
পৌরসভার পানি সরবরাহ শাখা সূত্রে জানা গেছে, শহরে প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ লিটার। কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৬০ লাখ লিটার, যা চাহিদার অর্ধেকেরও কম। ১৮টি পাম্পের মধ্যে কয়েকটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
এ বিষয়ে পৌরসভার ওয়াটার সুপার ও সহকারী প্রকৌশলী নিমাই চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে। ঈদের পর অকেজো পাম্পগুলো মেরামতের জন্য টেন্ডার দেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে দুটি নতুন মোটর স্থাপনের কাজও চলছে, তবে পুরো কার্যক্রম শেষ হতে সময় লাগবে।
তবে পৌরবাসীর অভিযোগ, যান্ত্রিক ত্রুটি ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অজুহাত দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে চাইছে। তীব্র গরমে যখন জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তখন ‘ঈদের পর সমাধান’—এমন আশ্বাসকে পরিহাস হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
শহরবাসীর দাবি, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ ট্যাংকারের মাধ্যমে পানি সরবরাহ, অকেজো পাম্প মেরামত এবং গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে সংকট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হোক। অন্যথায় এ সংকট বড় ধরনের জনঅসন্তোষে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
